ডার্ক মোড
Sunday, 12 July 2026
ePaper   
Logo
হাতিয়ায় বন্যা ৮০ গ্রামে প্লাবিত

হাতিয়ায় বন্যা ৮০ গ্রামে প্লাবিত

হাতিয়া (নোয়াখালী)প্রতিনিধি

এক সপ্তাহের অবিরাম ভারী বর্ষণ, অস্বাভাবিক জোয়ারের চাপ এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।


উপজেলার ৮০টিরও বেশি গ্রাম এখন সম্পূর্ণ পানির নিচে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বসতঘরের মেঝে পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় চরম মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছেন প্রায় অর্ধলক্ষাধিক বাসিন্দা।


পানিবন্দি পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। প্লাবিত হওয়ায় দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে হাতিয়া পৌরসভা, সোনাদিয়া, বুড়িরচর, হরণী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের নিচু এলাকাগুলোতে। কাঁচা-পাকা সড়ক, ঘরবাড়ি, ধর্মীয় উপাসনালয়, বাজার এবং ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।


স্থানীয় কৃষক সাইফুল ইসলাম উদ্বেগের সাথে জানান, আমনের বীজতলা, সবজি ক্ষেত ও মাছের পুকুর পানিতে ভেসে গেছে। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে, যা কৃষকদের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলবে।

মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এএম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ.ন.ম হাসান বলেন, *"অনেক বিদ্যালয়ের মাঠ ও প্রবেশপথ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে পারছে না। শুধু সাময়িক ত্রাণ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও খাল খনন এখন সময়ের দাবি।

পৌরসভার বাসিন্দা পান্না বেগম তাঁর দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, "ছয় দিন ধরে ঘরের ভেতর-বাইরে পানি। চুলা ডুবে থাকায় রান্না করা যাচ্ছে না। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। চারিদিকে শুধু পানি, কিন্তু খাওয়ার মতো এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি নেই।"

বন্যার পানিতে নলকূপগুলো তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র হাহাকার। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত পানি না কমলে এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও জ্বরের মতো পানিবাহিত রোগ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

এদিকে কাজ হারাচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। দিনমজুর সুলতান আহমদ জানান, টানা জলাবদ্ধতায় ঘর থেকে বের হতে না পারায় তাঁর আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ। সরকারি কিছু সহায়তা পেলেও পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকার উপক্রম হবে।


স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার জন্য মূলত দায়ী মানবসৃষ্ট কারণ। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাল ও নালা সংস্কার না হওয়া এবং খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

পৌরসভার ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন জানান, উপজেলা সদরের মার্টিন খালের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দোকানপাট ও মার্কেট গড়ে উঠেছে। ফলে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ থমকে গেছে। আগে ভারী বৃষ্টি হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যেত, আর এখন দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খাল পুনঃখনন না করলে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না।

 
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রাসেল ইকবাল জানান, প্রশাসন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে শুকনো খাবার ও সরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

সরকারি খালের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, "ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

 

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন