ডার্ক মোড
Saturday, 24 October 2026
ePaper   
Logo
সংবাদ বিশ্লেষণ :  মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬: হোয়াইট হাউস ও ক্যাপিটল হিলের ভাগ্য নির্ধারণে জটিল সমীকরণ  ​

সংবাদ বিশ্লেষণ : মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬: হোয়াইট হাউস ও ক্যাপিটল হিলের ভাগ্য নির্ধারণে জটিল সমীকরণ ​

হেমায়েত হোসেন

আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন টানটান উত্তেজনা। হাতে আর মাত্র ১২ দিন। আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন ।

মার্কিন ক্যাপিটল হিল বা কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ (House of Representatives) ও সিনেট (Senate) কার নিয়ন্ত্রণে যাবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল জল্পনা-কল্পনা।

ডেমোক্রেটিক পার্টি কি তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি রিপাবলিকানদের লাল তরঙ্গ পুনরায় ওয়াশিংটন পুনর্দখল করবে ?

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণের দিকে তাকালে এক জটিল ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের চিত্রই ফুটে ওঠে।

ট্রাম্পের অবস্থান ও রিপাবলিকান শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর শিরোনাম ‘ইলেকশন ডিসপ্যাচেস: ট্রাম্প ডিফেন্ডস রামাস্বামীস অ্যাটাক অ্যাড...’।

আমেরিকার রক্ষণশীল শিবিরের অভ্যন্তরীণ মেরুকরণকে সামনে এনেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো রিপাবলিকান পার্টির নীতি ও প্রার্থী বাছাইয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে ট্রাম্পের বিতর্কিত ভূমিকা এবং সহ-প্রার্থীদের হয়ে আক্রমণাত্মক প্রচার দলের ভিতরের বিভাজনকে যেমন স্পষ্ট করছে, তেমনি কট্টর সমর্থকদের চাঙ্গা রাখছে।

ওহাইওসহ প্রধান প্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোতে রিপাবলিকানদের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আক্রমণাত্মক কৌশল শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোটারদের কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বড় এক প্রশ্ন।

অর্থনীতির চাপ ও জনপ্রিয়তায় ভাটা :

নির্বাচনে জয়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামক সব সময়ই দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।

প্রযুক্তি ও বাণিজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনবিসি-র সাম্প্রতিক জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মিডটার্ম যত এগিয়ে আসছে, অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচক সর্বনিম্নে নেমেছে’ ।

মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক সুদের হার নিয়ে মার্কিন সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে রিপাবলিকানদের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি কিংবা ডেমোক্র্যাটদের গৃহীত পদক্ষেপ কোনটি ভোটারদের বেশি আশ্বস্ত করতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করছে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ।

সিনেটের ১০টি আসন:

ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি
আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এখন সিনেটের দিকে।

বার্তা সংস্থা সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে সিনেটের যে ১০টি আসন দল পরিবর্তনের (Flip) সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে...’।

মার্কিন সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা উভয় দলের জন্যই অস্তিত্বের লড়াই। বর্তমানে যে ১০টি আসনকে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ বা দোদুল্যমান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা ও উইসকনসিনের মতো অঙ্গরাজ্যগুলো অন্যতম।

এসব আসনে ভোটের ব্যবধান এতটাই সামান্য হতে পারে যে সামান্যতম ভোটার উপস্থিতি পুরো সিনেটের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

আগাম ভোট ও ডেমোক্র্যাটদের আশা :

নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন গণলাইনের ঝক্কি এড়াতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোট (Early Voting) শুরু হয়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যম এবিসি নিউজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘মূল কিছু অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের আগাম ভোটে অংশগ্রহণের উৎসাহ বেশ চোখে পড়ার মতো, তবে এটি সমীকরণের একটি অংশমাত্র’ ।

ঐতিহাসিকভাবেই ডেমোক্র্যাট সমর্থকরা আগাম ভোট বা ডাকযোগে ভোটে (Mail-in ballot) বেশি অংশ নেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান সমর্থকরা মূলত নির্বাচনের মূল দিনে সশরীরে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পছন্দ করেন। ফলে আগাম ভোটের প্রাথমিক গতিপ্রকৃতি দেখে চূড়ান্ত ফল অনুমান করা ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করছেন দেশটির অভিজ্ঞ নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

১২ দিনের শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ :

আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত হোয়াইট হাউসে থাকা ক্ষমতাসীন দল (বর্তমানে ডেমোক্র্যাট) প্রতিনিধি পরিষদে কিছু আসন হারায়। তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, গর্ভপাত সংক্রান্ত অধিকারের আইনি তর্ক এবং সর্বোপরি জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয়ের দ্বন্দ্বের কারণে এইবারের সমীকরণ আগের যেকোনো বারের চেয়ে ভিন্ন।

শেষ কথা :

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল ওয়াশিংটনের ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়; এটি আগামী ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগাম মহড়াও বটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, অর্থনীতি ও সিনেটের ভাগ্য নির্ধারণী আসনগুলোর ওপর ভিত্তি করে দুদলই এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। ভোটাররা অর্থনীতি ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেবেন, নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকবেন—তার উত্তর মিলবে আর মাত্র কয়েক দিন পরেই।


লেখক: ইংরেজি দৈনিক The Country Today পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন