মন্তব্য প্রতিবেদন : সৌদি আরবে দু'জন প্রবাসীর ফাঁসি : কূটনৈতিক ব্যর্থতা, ভিয়েনা কনভেনশন লংঘন ও প্রবাসীদের জন্য মায়া কান্না
হেমায়েত হোসেন
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে তথাকথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নাজেরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সিটি আক্তার এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, এই আটক, বিচারিক প্রক্রিয়া কিংবা দণ্ড কার্যকরের কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এ ঘটনা কেবল দুটি জীবনের মর্মান্তিক পরিণতিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
১৯৬১ সালের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন এবং ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্ক সংক্রান্ত ভিয়েনা কনভেনশনউভয় চুক্তিতেই বাংলাদেশ ও সৌদি আরব স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। এই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো দেশে কোনো বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার বা আটক করা হলে বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হবে এবং আটক ব্যক্তির জন্য আইনি সহায়তার পথ সুগম করতে হবে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ যদি আটক প্রবাসীদের কনস্যুলার সুবিধা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে থাকে কিংবা তাদের আইনি সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখে থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন প্রবাসীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার না দিয়ে এবং নিজ দেশের দূতাবাসকে না জানিয়ে সাজা কার্যকর করা কতটা ন্যায়সংগত ?
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। অথচ বারবার দেখা যায়, বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের আইনি ও মানবিক সুরক্ষা দিতে আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলো চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
সাজা কার্যকর করার পর সংবাদপত্র থেকে খবর পেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে বা ‘নোট ভার্বাল’ (আনুষ্ঠানিক চিঠি) পাঠিয়ে মূল দায় এড়ানো যায় না।
আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময় লেগেছে; তবে এই পুরো সময়ে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা দূতাবাস কী ভূমিকা পালন করেছে?
দূতাবাস কি তাদের নাগরিকদের খবর রাখতে সমর্থ হয়েছিল, নাকি তথ্য পাওয়ার কোনো কার্যকর মেকানিজমই সেখানে গড়ে ওঠেনি?
প্রবাসীদের দুর্দশায় রাষ্ট্রীয় নীরবতা বা কেবল ‘ব্যাখ্যা চাওয়া’র নীতি মূলত সরকারি অকার্যকারিতা ও উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর নিহতদের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করা, মরদেহ দেশে ফেরত আনা কিংবা স্বজনদের নিকট হস্তান্তরের বিষয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হলেও বিপদের সময় তাদের প্রতি যে রাষ্ট্রের কার্যকর কোনো অভিভাবকত্ব নেই এই ঘটনাটি আরও একবার তা প্রমাণ করল।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসীদের কল্যাণ ও সুরক্ষার বুলি আওড়ানো হলেও বাস্তবে তা যে "মায়া কান্না"তেই সীমাবদ্ধ থাকছে, প্রবাসীদের এই ক্ষোভকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও বিচারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে আরও কঠোর ও পেশাদার কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোই যথেষ্ট নয়; সৌদি সরকারের কাছে এই আন্তর্জাতিক প্রটোকল লঙ্ঘনের বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানানো এবং ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ ধারার সঠিক বাস্তবায়নে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যথায়, প্রবাসীদের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব হবে না।

