ডার্ক মোড
Monday, 02 November 2026
ePaper   
Logo
মন্তব্য প্রতিবেদন :  ​পোশাক খাতে অস্থিরতা : শ্রমাধিকার ও শিল্প রক্ষার দ্বিমুখী দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ

মন্তব্য প্রতিবেদন : ​পোশাক খাতে অস্থিরতা : শ্রমাধিকার ও শিল্প রক্ষার দ্বিমুখী দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ

হেমায়েত হোসেন

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তা ও জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করা, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ নানা দাবিতে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর এবং রাজধানীর মিরপুরসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গত কয়েক দিন ধরে শ্রমিকদের অসন্তোষ ও সহিংস বিক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভার-আশুলিয়ার ১৭৭টি কারখানা এবং কালিয়াকৈরের বিভিন্ন পোশাক প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দেশের অর্থনীতির এ প্রাণভোমরার চাকা স্তব্ধ হয়ে যাওয়া এবং শত শত কারখানা বন্ধ থাকার ঘটনা গোটা জাতীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য চরম অশনিসংকেত।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়বৃদ্ধি আজ পোশাকশ্রমিকদের কোণঠাসা করে ফেলেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি যেখানে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশের উপরে এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ ছুঁয়েছে, সেখানে বর্তমানে বলবৎ থাকা ১২,৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি দিয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা একেবারেই অসম্ভব।

সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন কাঠামোর কারণে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন বেড়ে ২০ হাজার টাকায় রূপ নেওয়ার পর শ্রমিক শ্রেণির মনে ক্ষোভ ও নায্য মজুরির দাবি আরো তীব্র হয়ে ওঠে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০২৬ সালের সংশোধিত ১৩৯(৬) ধারায় মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করায় শ্রমিকরা অবিলম্বে নতুন মজুরি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন।

শ্রমিকদের রুটি-রুজির লড়াই ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন বৃদ্ধির দাবি নীতিগতভাবে যৌক্তিক হলেও আন্দোলনকে পথভ্রষ্ট করে রাস্তা অবরোধ, বাসে অগ্নিসংযোগ, কারখানার গুদামে আগুন এবং পুলিশ বক্সে হামলার মতো যে ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কারখানা মালিকপক্ষ এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একদিকে বৈশ্বিক মন্দার কারণে মূল বাজার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আদেশ কমে গেছে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতার কারণে উৎপাদন খরচ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়েছে। এমন জটিল পরিস্থিতিতে ন্যূনতম মজুরি এক লাফে দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর যৌক্তিক ও গাণিতিক ভিত্তি কতটুকু, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। এই বোর্ডে মালিক, শ্রমিক এবং নিরপেক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপকসহ প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নিজে উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক ডেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কারখানা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, নিরীহ পোশাকশ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে যুক্ত কতিপয় বহিরাগত ও মুখোশধারী চক্রের অপচেষ্টাকে শক্ত হাতে দমন করা হবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতিসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের বক্তব্য স্পষ্ট—জনভোগান্তি কিংবা সহিংসতা শ্রমিকদের লক্ষ্য হতে পারে না; তবে শ্রমিকদের জন্য সময়োপযোগী ও মানবিক একটি মজুরি কাঠামো দ্রুত গঠন করা আবশ্যক। বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএ নেতাদের মতো আমাদেরও উপলব্ধি করতে হবে: ‘শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, আর শিল্প বাঁচলেই শ্রমিক বাঁচবে’।

শিল্পের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক শ্রমমান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সামঞ্জস্য রেখেই একটি সম্মানজনক সমাধান খুঁজে বের করা। সরকারকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের কার্যকর ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

একইভাবে, কারখানার উৎপাদন সচল রেখে মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিয়ে সংলাপের টেবিলেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ সুগম করতে হবে।

জাতীয় স্বার্থেই এই তৈরি পোশাক খাতকে অবিলম্বে সচল ও সুরক্ষিত রাখা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক ইংরেজি দৈনিক The Country Today

মন্তব্য প্রতিবেদন :  ​পোশাক খাতে অস্থিরতা : শ্রমাধিকার ও শিল্প রক্ষার দ্বিমুখী দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন