কাজের সন্ধানে গিয়ে রাশিয়ায় যুদ্ধের ফাঁদে বাংলাদেশীরা: জরুরি ভিত্তিতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে
হেমায়েত হোসেন
কাজের সন্ধানে প্রবাসে গিয়ে জীবনযুদ্ধের বদলে সরাসরি অস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আসল যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশি যুবকদের।
ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন কিংবা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সেখানে পৌঁছানোর পরেই কৌশলে বা জোরপূর্বক তাঁদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের অগ্রভাগে। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই আশঙ্কাজনক সত্য।
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিদেশি নাগরিকদের ব্যবহারের খবর আসছিল, তবে জাতিসংঘের এই সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পরিস্থিতিটির ভয়াবহতা বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট করে তুলেছে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে জমা দেওয়া কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রতারণা বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রুশ সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিভিল কোম্পানিতে চাকরি বা বিজনেস ভিসার কথা বলে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে প্রয়োজনীয় সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইউক্রেন সীমান্তের সম্মুখ সমরে। এতে ইতিমধ্যে বহু বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন, যা স্বজনদের চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলেছে।
রাশিয়ায় বাংলাদেশি তরুণদের এভাবে যুদ্ধের ফাঁদে পড়ার সংবাদ এটিই প্রথম নয়। এর আগেও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ও প্রাণহানির খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এতকিছুর পরও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। মানব পাচারচক্র ও ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে দেশে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তরুণ এই ফাঁদে পা দিচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি ও স্পর্শকাতর বিষয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
প্রতারণার শিকার হয়ে এভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিনদেশের যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারের উচিত বিষয়টি সর্বোচ্চ কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা। মস্কোয় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কোন কোন এজেন্সির মাধ্যমে এই তরুণদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে বলপূর্বক চুক্তিতে আবদ্ধ বাংলাদেশি যুবকদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে সক্রিয় মানব পাচারকারী ও ভুয়া এজেন্টদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আর বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।
অবিলম্বে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জরুরি ব্যবস্থা না নিলে আরও বহু প্রবাসীর জীবন অকালে ঝরে পড়বে, যা জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এখনই জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা না করলে এবং বাংলাদেশীদের প্রাণহানি হলে এর দায় -দায়িত্ব সরকারের উপর বর্তাবে।
ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ভাইরাল হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি যা দুঃখজনক।
লেখক ইংরেজি দৈনিক The Country Today পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক

