মন্তব্য প্রতিবেদন: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি: সংকট, ভূ-রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
হেমায়েত হোসেন
মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও আঞ্চলিক অস্থিরতা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে গভীর উদ্বেগের ছায়া ফেলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধিতে যে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব এসে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সংকটটি কেবল দূরপ্রাচ্যের কোনো সামরিক লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কোটি মানুষের রুটি-রুজি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব।
বৈশ্বিক এই সংকট বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান এবং প্রধানতম স্তম্ভ হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রায় অর্ধ-কোটিরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স।
বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিমান চলাচলে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার ফলে ইতিমধ্যেই গন্তব্যমুখী হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে বিমানবন্দরে ও দেশে চরম বিপাকে পড়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শ্রমবাজারের কড়া নিয়ম অনুযায়ী, অনেক প্রবাসীর ভিসার (আকামা) বা ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা শেষের পথে; ফ্লাইট না পাওয়ায় তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্পন্সর বা কফিলদের অধীনে উপস্থিত হতে পারছেন না। ফলে তাদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তো রয়েছেই, উপরন্তু আকামার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় দেশগুলো থেকে তাদের স্থায়ীভাবে ডিপোর্ট বা বহিষ্কারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
প্রবাসীদের এই বিশাল অংশ কর্মহীন হয়ে পড়লে বা দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হলে তা দেশের শ্রমবাজারে নতুন বেকারত্বের বিস্ফোরণ ঘটাবে। একইসঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে, যা আমদানির এলসি খোলা এবং দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যোগানকে ব্যাহত করবে।
সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান ও সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত পুরো লোহিত সাগর, বাবে আল-মান্দেব প্রণালী এবং সংলগ্ন অঞ্চলের আকাশ ও নৌপথকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া বা নতুন করে রক্তক্ষয়ী রূপ নেওয়ার পেছনে বৈশ্বিক পরাশক্তি, বিশেষ করে আমেরিকার ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী রাষ্ট্রগুলোর কাছে শত শত বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রির বিশাল বাণিজ্যিক বাজার সৃষ্টি ও তা ধরে রাখা এবং ওই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার একটি সুদূরপ্রসারী ও প্রচ্ছন্ন কৌশল হিসেবেও এই অস্থিরতাকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আমেরিকার এই ধরনের দ্বিমুখী নীতি ও অস্ত্র ব্যবসার রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষকে যেমন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি তেলসমৃদ্ধ এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলছে। এই সংঘাতের ফলে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা চলাচলে বাধার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং শিপিং কস্ট বা পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমনিতেই একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।
এহেন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চরম ভঙ্গুরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য আমদানি করতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলবে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারগুলোতে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরে বেকার সমস্যার সমাধান আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় এই বিশাল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদে বেকার বা হতাশ থাকলে, তা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই অত্যন্ত বিচক্ষণ কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা এবং কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও লবিং জোরদার করতে হবে, যাতে আটকে পড়া প্রবাসী শ্রমিকদের আকামার মেয়াদ বিনা মূল্যে বা সহজ শর্তে বৃদ্ধি করা হয় এবং তারা যেন সহজেই নির্দিষ্ট কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান।
দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ওপর দেশের একমুখী নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে পূর্ব ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার উদীয়মান দেশগুলোতে নতুন শ্রমবাজার উন্মোচনের জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও অপচয় কমানো এবং কঠোরহস্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।
বৈশ্বিক পরাশক্তিদের অস্ত্র ব্যবসা ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে যেন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কোটি প্রবাসীর রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থনৈতিক অর্জনগুলো চিরতরে ধূলিসাৎ না হয়, সেজন্য নীতিনির্ধারক মহলকে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

