মন্তব্য প্রতিবেদন : কুমিল্লায় অপ্রীতম হত্যা ও ক্রমবর্ধমান শিশু অপরাধ: শিশু আইনের ফাঁকফোকর ও বিচারহীনতার সংকট
হেমায়েত হোসেন
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক দম্পতির ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রীতমকে কেবল একটি আইফোনের লোভে নির্মমভাবে হত্যা করে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়।
সামান্য প্রযুক্তিপণ্যের মোহে কিশোর গ্যাং ও তরুণ অপরাধীদের এমন ভয়াবহ রূপ স্পষ্ট করে যে দেশের সমাজব্যবস্থা ও নিরাপত্তাকাঠামো চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গণমাধ্যমে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিনিয়তই শিশু হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই ও লাশ উদ্ধারের খবর উঠে আসছে।
সামাজিক অবক্ষয় ও ডিজিটাল প্রলোভন
অপ্রীতম হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃতরা অপ্রীতমকে ফুঁসলিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে যায় এবং বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
স্মার্টফোন বা আইফোনের মতো বস্তুকেন্দ্রিক প্রলোভন আজ কিশোর-তরুণদের মানসিকতাকে কতটা হিংস্র ও বেপরোয়া করে তুলছে, এটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, গ্যাং কালচার ও সামাজিক মূল্যবোধের দ্রুত অবক্ষয় নতুন প্রজন্মকে অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
শিশু আইন, ২০১৩-এর জটিলতা ও আইনি ফাঁকফোকর :
বাংলাদেশের 'শিশু আইন, ২০১৩' অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী যে কাউকেই শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আইনের ধারা ৩৪(১) অনুযায়ী, কোনো শিশু অপরাধী হত্যা বা চরম নৃশংস অপরাধ করলেও তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ১০ বছর আটকে রাখার বাইরে কঠোর সাজা বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না।
অপরাধীদের বয়স ১৮-র সামান্য কম হওয়ায় তারা আইনি সুরক্ষার সুফল পাচ্ছে। এর ফলে সমাজে এই বার্তা যাচ্ছে যে গুরুতর অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব, যা নতুন করে অপরাধের উৎসাহ জুগিয়েছে।
জামিন ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রভাব :
প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের বারবার সহজে জামিন পাওয়া এবং জামিনদারদের কোনো দায়বদ্ধতা না থাকা অপরাধীদের দুঃসাহস আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও উপযুক্ত সাজার অভাবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সমাজে নিরাপত্তাহীনতাবোধ তীব্র রূপ নিচ্ছে।
অভিভাবকত্ব ও পারিবারিক ব্যবস্থার সংকট :
বর্তমান সময়ে সন্তান শাসন বা সঠিক পরিচর্যার ক্ষেত্রেও অভিভাবকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতা বা নজরদারির অভাব—দুই-ই সন্তানকে ঝুঁকিতে ফেলছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও নজরদারির অভাবে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত শঙ্কার মধ্যে বসবাস করছে।
বর্তমানে এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নবর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে :
১. আইন সংস্কার: জঘন্য ও পরিকল্পিত হত্যা বা অপরাধের ক্ষেত্রে 'শিশু আইন, ২০১৩'-এর বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করে অপরাধের ভয়াবহতা অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান প্রণয়ন করা দরকার।
২. দ্রুতবিচার ও কার্যকর শাস্তি: শিশু হত্যা ও অপহরণের মামলাগুলো দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে সংক্ষিপ্ত সময়ে রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. জামিন নীতি কড়াকড়ি: বারবার অপরাধে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের জামিন রোধ করা এবং ভুয়া বা দায়িত্বহীন জামিনদারদের আইনি শাস্তির মুখোমুখি করা নিশ্চিত করা জরুরি।
৪. ডিজিটাল ও সামাজিক নজরদারি: কিশোর গ্যাং দমনে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।
৫. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানরা কার সাথে মিশছে এবং প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করছে—সে বিষয়ে পরিবার থেকেই নৈতিক শিক্ষা ও সুনির্দিষ্ট নজরদারি রাখা আবশ্যক।
অপ্রীতমের ন্যায় নিষ্পাপ শিশুর জীবনপ্রদীপ অকালে নিভে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই এক ভয়াবহ প্রতিফলন।
কেবল আলোচনা বা সমবেদনায় সীমাবদ্ধ না থেকে অপরাধীদের কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং প্রচলিত আইনের কার্যকর সময়োপযোগী সংস্কার নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
আশা করি বর্তমান বিএনপি সরকার শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মত জঘন্য অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করবেন অথবা বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ করবেন।

