মন্তব্য প্রতিবেদন: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও 'মব সন্ত্রাস': কঠোর পদক্ষেপের এখনই সময়
হেমায়েত হোসেন
সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা ও বেপরোয়া হিংস্রতা সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবনকে অতীষ্ঠ করে তুলেছে। এই গ্যাং কালচার ও কিশোর অপরাধ দমনে সম্প্রতি দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই প্রশংসার দাবি রাখে।
ইতোমধ্যে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল থেকেও বার্তা দেওয়া হয়েছে—পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে আরও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফেরাতে এ ধরনের জিরো টলারেন্স নীতি একটি ইতিবাচক সংকেত।
তবে কেবল সাময়িক কিংবা বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযান চালিয়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।
কিশোর অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান যা প্রতিদিন সংবাদপত্রে উঠে আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিনিয়ত কিশোরদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্যাং কালচারের বলি হতে হচ্ছে বহু প্রাণ, বহু পরিবার হারাচ্ছে তাদের সন্তানদের। সংবাদপত্র ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে সারাদেশে কিশোর অপরাধের শিকার হয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছে অনেককে। কিন্তু শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়িয়ে সমস্যার মূলোৎপাটন করা যাবে না, যদি না অপরাধের পেছনে থাকা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা হয়।
ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকে দেশে যে ‘মব কালচার’ বা মব সন্ত্রাসের সূচনা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা এখনো লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে এসেও যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা বা মব জাস্টিসের মতো প্রবণতা দৃশ্যমান হয়, তখন তা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের বার্তা দেয়।
মানুষ ভেবেছিল ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই বিশৃঙ্খলা দ্রুত দূর হবে। কিন্তু মব সন্ত্রাস কিংবা সামাজিক অপরাধ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সম্প্রতি ঢাকা শহরে দুইটি আলোচিত দখলের ঘটনা জনমনে আরো আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন, একটি দেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্বতঃস্ফূর্ত বিদেশি বিনিয়োগ আনার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুশাসন ও স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। কোনো দেশ বা বিদেশি বিনিয়োগকারী যদি দেখে যে সেখানে আইনের শাসন দুর্বল, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অথবা মব সন্ত্রাসের ঝুঁকি রয়ে গেছে, তবে তারা সেখানে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পরিস্থিতি অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। রাজপথ কিংবা সামাজিক পরিমণ্ডলে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে এবং সরকার যদি দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারে, তবে বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী—বিশেষ করে জামায়াতসহ অন্যান্য প্রতিপক্ষ জোটগুলো এই প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
দেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা এবং বিরোধীদের কৌশলগত সুযোগ না দেওয়ার একমাত্র পথ হলো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অতএব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট, দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে।
কিশোর অপরাধের সামাজিক ও রাজনৈতিক শেকড় উপড়ে ফেলার পাশাপাশি ‘মব সংস্কৃতি’ পুরোপুরি বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা, অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিধানে সরকারের এই সক্রিয়তা যত দ্রুত দৃশ্যমান হবে, দেশের সার্বিক সুশাসন ও অর্থনীতির জন্য তা ততই মঙ্গলজনক হবে।

