ডার্ক মোড
Sunday, 12 July 2026
ePaper   
Logo
তানোরের কামারগাঁ খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহে সিন্ডিকেটের দাপট: বঞ্চিত প্রান্তিক চাষিরা

তানোরের কামারগাঁ খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহে সিন্ডিকেটের দাপট: বঞ্চিত প্রান্তিক চাষিরা

সোহানুল হক পারভেজ, তানোর (নাটোর)

তানোর উপজেলার কামারগাঁ সরকারি খাদ্য গুদামে অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহ অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। জুয়েল নামে রাজনৈতিক প্রভাবশালী এক ব্যক্তি খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে একটি অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে। এই সিন্ডিকেটের একচেটিয়া দাপটের কারণে প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকরা ন্যায্য মূল্য এবং সরাসরি সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।

চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানে সাধারণ কৃষকদের গুদামে ধান দেওয়ার সুযোগ থেকে প্রায় বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে, জুয়েল অনেক তালিকাভুক্ত কার্ডধারীর অজান্তেই তাঁদের কৃষি কার্ড ভাড়া নিয়ে বিপুল পরিমাণ ধান গুদামে জমা দিচ্ছেন। সাধারণ কৃষকেরা যখন সরাসরি ধান বিক্রি করতে যাচ্ছেন, তখন আর্দ্রতা (ময়েশ্চার) বেশি বা নিম্নমানের অজুহাতে গুদাম কর্মকর্তারা তাঁদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। নিরুপায় ও হতাশ হয়ে অনেক প্রান্তিক চাষি সিন্ডিকেটের কাছে তাঁদের সরকারি কার্ড ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

কামারগাঁ ইউনিয়নের রুবেল, শহিদুল, গণেশ ও ফারুকসহ একাধিক কৃষক জানান, আর্দ্রতার অজুহাতে তাঁদের ধান গুদাম থেকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ পরবর্তীতে সেই একই ধান বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করলে, সিন্ডিকেট সদস্যরা কোনো ঝামেলা ছাড়াই তা সরকারি গুদামে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কার্ডধারী কৃষকের সশরীরে উপস্থিতিতে ধান সংগ্রহ করার কথা থাকলেও সিন্ডিকেটটি শত শত নিষ্ক্রিয় বা এবার ধান চাষই করেননি—এমন ব্যক্তিদের কার্ড ব্যবহার করে এই বাণিজ্য চালাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ধানের মান যাচাইয়ের নিয়ম পুরোপুরি উপেক্ষা করে প্রতি মেট্রিক টনে ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষের বিনিময়ে অন্য জেলা থেকে আনা ধানও কামারগাঁ এলএসডি (লোকাল সাপ্লাই ডিপো) গুদামে ঢোকানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ, কৃষকদের ফোন লগ এবং ধানের আর্দ্রতা পরীক্ষার রেকর্ড খতিয়ে দেখলেই এই জালিয়াতি অবিলম্বে প্রমাণিত হবে।

বর্তমানে খোলা বাজারে মোটা ধানের দাম প্রতি মণ ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা হলেও সরকারি সংগ্রহ মূল্য প্রতি মণ ১,৪৪৪ টাকা (৩৬ টাকা কেজি)। এই বিশাল ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সিন্ডিকেটটি পাবনা, নাটোর ও নওগাঁ থেকে কম দামে ধান এনে তানোর গুদামে ডাম্পিং করে প্রতি মণে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অবৈধ মুনাফা পকেটে ভরছে। এই ব্যাপক দুর্নীতির কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের কৃষক-বান্ধব ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

চলতি বছরের গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে তানোরে আনুষ্ঠানিকভাবে বোরো ধান সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধন করা হয়। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, মিলারদের কাছ থেকে ৪৯ টাকা কেজি দরে ৪০৬ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল, ৩০০ মেট্রিক টন গম এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে ১,৫৬০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এই অভিযান চলার কথা রয়েছে। এর মধ্যে কামারগাঁ খাদ্য গুদামের লক্ষ্যমাত্রা হলো কামারগাঁ ও কলমা ইউনিয়ন থেকে ৫৫৫ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষমতাসীন দলের এক সিনিয়র নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে একদল প্রভাবশালী রাজনৈতিক সুবিধাবাদী কামারগাঁ গুদামের কার্যক্রম জিম্মি করে ফেলেছে। তারা ইউনিয়ন ভাগ করে সাধারণ কৃষকদের ভোটার আইডি সংগ্রহ করেছে এবং জালিয়াতির মাধ্যমে একটি মনগড়া তালিকা তৈরি করেছে।" তিনি আরও জানান, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে বঞ্চিত প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব তিনি করেছিলেন, কিন্তু সিন্ডিকেটের লোভের কারণে তা ভেস্তে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কৃষক-কল্যাণমূলক উদ্যোগ নস্যাৎকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তির ব্যবস্থা নিতে তিনি দলের হাই কমান্ডের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে কামারগাঁ খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এলএসডি) আতিকুর রহমান আতিক বলেন, "আমরা ২০২৬ সালের সরকারি নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শস্য সংগ্রহ করছি এবং কেবল বৈধ কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কেনা হচ্ছে।" একইভাবে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (টিসিএফ) পারভীন জানান, এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ তিনি পাননি, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে কামারগাঁ ইউনিয়নের হরিপুর, ছাওড়, মালশিরা, কচুয়া ও কাদীপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। প্রায় ৫০ জন কৃষকের সাথে কথা বললে তাঁরা জানান, সরকারি ধান সংগ্রহের কথা তাঁরা শুনলেও কীভাবে বা কখন তা হচ্ছে সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এলাকায় কোনো প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়নি, ফলে অধিকাংশ প্রকৃত চাষি সরকারি মূল্য বা সরাসরি গুদামে ধান বিক্রির অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছেন।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন