ডার্ক মোড
Saturday, 18 July 2026
ePaper   
Logo
বিসিআরএস-এর মানবাধিকার প্রতিবেদন:  ৬ মাসে গণপিটুনিতে ১৩৫ জন নিহত, ২৫৬ জন আহত

বিসিআরএস-এর মানবাধিকার প্রতিবেদন: ৬ মাসে গণপিটুনিতে ১৩৫ জন নিহত, ২৫৬ জন আহত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) সারা দেশে এই ধরনের ২৬৩টি ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত এবং ২৫৬ জন আহত হয়েছেন।

চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, কথা-কাটাকাটি, আধিপত্য বিস্তার এবং ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অজুহাতে এই গণপিটুনির ঘটনাগুলো ঘটেছে। গত বছর (২০২৫ সাল) একই সময়ে মব ভায়োলেন্সের ১৪১টি ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হয়েছিলেন। সেই তুলনায় এবার নিহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

আজ শনিবার (১৮ জুলাই) বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস) গত ছয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করে। মূলধারার জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনের নিজস্ব সংগৃহীত তথ্য এবং তথ্যানুসন্ধান রিপোর্টের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক শেখ মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, গণপিটুনি, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও শ্রমিক নি নিপীড়ন, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো বিষয়গুলো সমাধান করা না হলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দলীয় কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী স্বাধীনতায় ৫৮ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৯ জন বিএনপির (৬৮%), ৬ জন জামায়াতে ইসলামীর (১১%) এবং ৩ জন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। রাজনৈতিক সহিংসতার ৮৩২টি ঘটনার মধ্যে ৬৭৫টিই (৮১.২%) ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা অন্য দলের সাথে সংঘাতের কারণে। এছাড়া ৫ হাজার ২৪৬ জনেরও বেশি রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ হামলার শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩৯৬টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২,৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০-রও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

বিগত ছয় মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের মধ্যকার সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অন্তত ১৪৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩,২৬৮ জন নামীয় আসামির পাশাপাশি ২৪,৫১৮ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের (১,০৪২ জন) তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বেশি। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের মধ্যে ৪০৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৯ শতাংশই (২৩৮ জন) অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়সী শিশু ও কিশোরী। এছাড়া ৮৮ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

পাশাপাশি যৌতুকের কারণে ১৯ জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতার কারণে ৩২০ জন নারী নিহত ও ২১১ জন আহত হয়েছেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ১৪৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো গত ছয় মাসে ৪০টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ৩১১ জন আহত এবং ৩৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আওতায় ৩০টি মামলায় ৮১ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং ৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

একই সময়ে ২০০টি ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৩৪ জন আহত, ৬০ জন লাঞ্ছিত, ৪৯ জন হুমকিতে পড়েছেন এবং ১১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫০টি হামলায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা এবং ৪৩টি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২টি ঘটনায় বিএসএফ-এর হামলায় ৯ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত (১৪ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংসতার ঘটনায় ১ জন নিহত এবং ৫ জন গুলিবিদ্ধসহ ১০ জন আহত হয়েছেন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত "বন্দুকযুদ্ধে" ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৫৮ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের, ১ জন বিএনপির এবং ৪২ জন সাধারণ বন্দি ছিলেন।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন