ডার্ক মোড
Thursday, 20 August 2026
ePaper   
Logo
টেন্ডার ছাড়াই থানচি বাজার মাল্টিপারপাস হস্তান্তর, বৈধ ইজারাদারকে পাশ কাটানোর অভিযোগ

টেন্ডার ছাড়াই থানচি বাজার মাল্টিপারপাস হস্তান্তর, বৈধ ইজারাদারকে পাশ কাটানোর অভিযোগ

সোহেল কান্তি নাথ, বান্দরবান

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন থানচি বাজার মাল্টিপারপাস ইজারা হস্তান্তরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর সুজিত বড়ুয়ার যোগসাজশে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এসব অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বৈধ ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই থানচি বাজার মাল্টিপারপাস দ্বিতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এতে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বৈধ ইজারাদার শৈক্যচিং মারমা। টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনিয়মে পরিষদের কর্মচারী সুজিত বড়ুয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও এবার বৈধ ইজারাদারকে পাশ কাটিয়ে বাজারটি দ্বিতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তবে এ বিষয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই অবগত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন।

জানা যায়, ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লার সময়ে টেন্ডারের মাধ্যমে ৩২ লাখ টাকায় থানচি বাজার মাল্টিপারপাসের ইজারা পান ঠিকাদার শৈক্যচিং মারমা। চুক্তি অনুযায়ী ইজারার মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত। এছাড়াও ভ্যাটসহ প্রতিবছর ৬ লাখ ২৭ হাজার টাকা করে পরিশোধ করার কথা। শৈক্যচিং মারমা ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চার বছরের জন্য মোট ২৫ লাখ ৭ হাজার টাকা পরিশোধ করার সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই থানচির বিএনপি নেতা মংশৈম্রাই মারমার কাছে ২৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় বাজারটি ইজারা দেওয়ার অভিযোগ আছে সুজিতে বিরুদ্ধে।

দ্বিতীয় চুক্তিপত্রে দেখা গেছে, নতুন ইজারাদার ও বিএনপি নেতা মংশৈম্রই মারমা চলতি বছরে ১ এপ্রিল হতে ৩১ ডিসেম্বর ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য বিনা টেন্ডারে নাম মাত্র একটি চুক্তিপত্র মূলে প্রথম কিস্তি হিসেবে ১৫ লাখ টাকা জমা দেন। বাকি ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চলতি বছরে পহেলা ডিসেম্বর মাসে পরিশোধ করা উল্লেখ রয়েছে। তবে এ ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিজ্ঞপ্তি, দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। শুধু থানচি বাজার মাল্টিপারপাস নয়, জেলা পরিষদের বিভিন্ন গেইট, বাজার শেডসহ প্রতিটি টেন্ডারের কার্যক্রমে সুজিত বড়ুয়ার বিরুদ্ধে আগেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই ও ইজারাদার মংশৈম্রাই মারমার মধ্যে সম্পাদিত থানচি বাজার মাল্টিপারপাসের চুক্তিপত্রে কোনো সাক্ষীর নাম পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু সাক্ষীর নাম না থাকাই নয়, এ বিষয়ে জেলা পরিষদের মাসিক সভায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না কিংবা নতুন করে কোনো টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে, আগের ইজারাদার শৈক্যচিং মারমা ও তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে সাক্ষীদের নাম, কিস্তি পরিশোধের ধাপ ও অন্যান্য শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। শৈক্যচিং ধাপে ধাপে ইজারার টাকা পরিশোধ করে বাজার শেড পরিচালনা করে আসছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পরিষদের এক সদস্য বলেন, শৈক্যচিংকে বাদ দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়ার সময় তাকে আর্থিক লেনদেনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি এতে রাজি না হয়ে বরং বিষয়টির অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বৈধ ইজারাদার শৈক্যচিং মারমার অভিযোগ, ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গোপনে থানচি বাজার মাল্টিপারপাস বিএনপি নেতা মংশৈম্রাই মারমার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে পাওনা কিস্তির টাকা হিসেবে দুই বছরের ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিতে তাকে চাপ প্রয়োগ করেন কম্পিউটার অপারেটর সুজিত বড়ুয়া।

শৈক্যচিং বলেন, তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার পরও ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাজারটি দ্বিতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ইজারার নিয়মানুযায়ী, কোনো ইজারাদার চুক্তি অনুযায়ী ইজারার টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রথমে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিধান রয়েছে। এরপরও টাকা পরিশোধ না করলে আইনানুগত প্রক্রিয়ায় পাওনা আদায় ও পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইজারা বাতিলের পর নতুন করে জেলা পরিষদের মাসিক সভায় বিষয়টি উত্থাপন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং টেন্ডার বা দরপত্রের মাধ্যমে নতুন ইজারাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা।

কিন্তু থানচি বাজার মাল্টিপারপাসের ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়ার কোনোটি অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

শৈক্যচিং মারমা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ইজারা নিয়ে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে পাশ কাটিয়ে অন্য ব্যক্তির কাছে বাজারটি হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে দুই বছরের কিস্তির টাকা একসঙ্গে জমা দেওয়ার জন্য সুজিত বড়ুয়া তাকে বারবার চাপ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে সুজিত বড়ুয়া বলেন, ইজারাদার শৈক্যচিং মারমা ভাড়া বকেয়া রাখায় তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বিধি অনুযায়ী ইজারার টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিনা টেন্ডারে কীভাবে থানচি বাজার মাল্টিপারপাস ইজারা দেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুজিত বড়ুয়া রাগান্বিত হয়ে বলেন, বিগত সরকারের আমলেও বিনা টেন্ডারে ইজারা দেওয়া হয়েছিল, তাই বর্তমানেও বিনা টেন্ডারে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আমি যা করব, আমার ক্ষমতায় করব; আমার কথায় চলবে।’

এ বক্তব্যের বিষয়ে বান্দরবান জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল মনছুরের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি এড়িয়ে যান।

পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, যেহেতু বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে, সেহেতু আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সমাধান করা হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে থানচি বাজার মাল্টিপারপাসের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এর বেশি তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই বলেন, সরকারি ইজারা অনুযায়ী ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত থানচি বাজার মাল্টিপারপাসের বৈধ ইজারাদার শৈক্যচিং মারমা।

তিনি বলেন, ইজারার মেয়াদ থাকা অবস্থায় কীভাবে অন্য একজনের কাছে বাজারটি হস্তান্তর করা হয়েছে, তা তার জানা নেই। যারা এ কাজ করেছেন, তারা সঠিক করেননি। ইজারা বা টেন্ডার ছাড়া এভাবে সরকারি স্থাপনা হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন