স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের পাহাড়: আফতাবের সঙ্গে সিন্ডিকেট, বদলি-কেনাকাটায় ওপেন সিক্রেট কমিশন
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও সংস্কার নিশ্চিত করতে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও স্বাস্থ্য খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দুর্নীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না।
গত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর স্বাস্থ্য সচিব হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী। তবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, বেপরোয়া দুর্নীতি এবং ‘বিজনেস অব রুলস’ ভাঙার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী কিছু ঠিকাদার, অসাধু ব্যবসায়ী এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর আমলাদের পুনর্বাসন করে তিনি মন্ত্রণালয়ে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছেন বলে জানা গেছে।
এমনকি সরকারের ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’ তার এহেন কর্মকাণ্ডের কারণে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার সুনির্দিষ্ট তথ্য ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে।
তদন্তে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োজিত থেকে যারা সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদেরই এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসিয়েছেন সচিব কামরুজ্জামান।
উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ: ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা জুলাই আন্দোলনে গুলির নির্দেশদাতা ছিলেন। বর্তমানে তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-১ এবং সচিবের গোপনীয় কাজ সম্পাদনের জন্য ‘বিকল্প পিএস’ হিসেবে অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আন্দোলনের সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখা ও গুলির নির্দেশ দেওয়া এই কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে ‘স্বাস্থ্য-৪’ শাখার দায়িত্ব।
বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে প্রশাসন-২ ও প্রশাসন-৪ শাখার মতো দুটি স্পর্শকাতর শাখার দায়িত্ব দিয়েছেন সচিব।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই সচিব একক সিদ্ধান্তে এই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কর্মকর্তাদের অতীতের অপরাধ ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন সচিব।
এছাড়া বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে বগুড়া, বাগেরহাট, কক্সবাজার ও রংপুরের সাবেক ডিসি এবং আওয়ামী লীগের সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলামের পিএস-এর মতো দলীয়করণে ভূমিকা রাখা কর্মকর্তাদেরও তিনি নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছেন।
সব সরকারের আমলেই ‘আফতাবের রাজত্ব’:
স্বাস্থ্য সেক্টরের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এইচ টি এম সে’র মালিক আফতাব আহমেদের সাথে সচিব কামরুজ্জামানের গোপন সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আওয়ামী আমলে শেখ হাসিনার জামাতার পার্টনার হিসেবে পরিচিত ফরিদপুরের বাসিন্দা আফতাব আহমেদ সব সরকারের আমলেই বহাল তবিয়তে থাকেন। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক, মোহাম্মদ নাসিম ও জাহিদ মালেকদের সময়ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই আফতাব আহমেদের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা সমমূল্যের ইউরো উপঢৌকন (ঘুষ) নিয়েছেন কামরুজ্জামান। সচিব সময় পেলেই আবাহনী মাঠের পাশে আফতাবের অফিসে যাতায়াত করেন।
এই সিন্ডিকেটের কারণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ইউনিভার্সিটি প্রকল্পের প্যাকেজ-২ এর কাজ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ওই প্রকল্পে ১ম সর্বনিম্ন দরদাতা ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন, ২য় এনডিই এবং ৩য় স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ারিং বাদ পড়ার পর, ৪র্থ অবস্থানে থাকা ‘মজিদ এন্ড সন্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিকভাবে কাজ পাইয়ে দিতে ফাইল আটকে রেখেছেন সচিব।
অভিযোগ রয়েছে, মজিদ এন্ড সন্সের জমা দেওয়া চাইনিজ নথিপত্রে মূল মালিকের ভুয়া ও জাল স্বাক্ষর রয়েছে। এছাড়া অতীতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো কাজ না করেই তৎকালীন পরিচালক ডা. উত্তম বড়ুয়ার মাধ্যমে আফতাব আহমেদ ১৮ কোটি টাকা তুলে নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর তার লাইসেন্স কালো তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে টাকা, গাড়ি ও নারীর প্রলোভন দেখিয়ে বর্তমান সচিবকেও আফতাব পুরোপুরি কবজায় রেখেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
বদলি-পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য :
চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বদলি এবং পদোন্নতি এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ চিকিৎসকদের বদলি বা পদোন্নতির জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ১০ লাখ এবং গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা বনিবনা না হলে চিকিৎসকদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়।
মন্ত্রণালয়ের নিয়ম (ডেলিগেশন অব ফিনান্সিয়াল পাওয়ার) অনুযায়ী কেনাকাটা ও অর্থ পরিশোধের নথি মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারক পর্যায়ে অনুমোদনের কথা থাকলেও, সচিব কামরুজ্জামান নিজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তা অনুমোদন দিচ্ছেন। বিভিন্ন ঠিকাদারি বিল ও সিএমএসডি (CMSD)-এর বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরাসরি ২% থেকে ৫% পর্যন্ত কমিশন বা ‘পিসি’ নেওয়া হচ্ছে, যা এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপেন সিক্রেট।
ফাইল আটকে রাখাই সচিবের হাতিয়ার।
নেপথ্যে পিএস সাকিব :
মন্ত্রণালয়ের কাজের গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা ফেরানোর পরিবর্তে ফাইল আটকে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করাকে হাতিয়ার বানিয়েছেন সচিব। তার দফতরে কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ১০ থেকে ৩০ দিন, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত পড়ে থাকে। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নথিতে আলোচনার জন্য নোট দিলেও সচিব তা তোয়াক্কা না করে তাচ্ছিল্যের সাথে ফেলে রাখেন।
এই পুরো সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন সচিবের পিএস নাজমুস সাকিব। বিগত সরকারের আমলে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে ১ম সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই আমলা ফ্যাসিবাদের অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে তিনি সচিবের আর্থিক লেনদেনের মূল দেখভাল করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

