ডার্ক মোড
Friday, 24 July 2026
ePaper   
Logo
স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে বেপরোয়া দুর্নীতি ও ফ্যাসিস্ট দোসরদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ

স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে বেপরোয়া দুর্নীতি ও ফ্যাসিস্ট দোসরদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি

এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরী বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পদোন্নতি বঞ্চিত থাকার অজুহাতে তিনি অর্থলিপ্সায় উন্মুত্ত হয়ে পড়েছেন এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন বলে দাবি সমালোচকদের।

বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে—বিশেষ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও ডা. আ ফ ম রুহুল হকের সময়ে—স্বাস্থ্য খাত ব্যাপক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান গণতান্ত্রিক বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করে। তবে নাগরিক সমাজ ও পর্যবেক্ষণদের মতে, কতিপয় চুক্তিভিত্তিক আমলার বেপরোয়া দুর্নীতি এবং বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের এই নীতি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিযোগ সূত্রের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকালে যেসকল কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চরম দমনপীড়ন এবং দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেককে সচিবের ঘনিষ্ঠ হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। তৎকালীন সময়ে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা এবং ছাত্রলীগ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত উপ-সচিব সুজিত দেবনাথকে প্রশাসন-১ শাখায় পদায়ন করে সচিবের গোপনীয় কাজ পরিচালনার জন্য বিকল্প পিএস হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলনকালে গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত অপর উপ-সচিব স্নেহাশীষকে স্বাস্থ্য শাখা-৪-এর দায়িত্বে বসানো হয়েছে। একইভাবে আন্দোলনকালে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা সিনিয়র সহকারী সচিব খন্দকার রবিউল ইসলামকে প্রশাসন-২ ও প্রশাসন-৪ শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীকে না জানিয়ে সচিব একক সিদ্ধান্তে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদায়ন করেছেন বলে জানা গেছে।

নিজেকে 'বিএনপি সমর্থক' ও 'জুলাইযোদ্ধা' হিসেবে দাবি করলেও সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বিগত শাসনআমলের দোসর ও সুবিধাবাদী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসিত করে অবৈধ অর্থ আয়ের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বগুড়া, বাগেরহাট, কক্সবাজার ও রংপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলামের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রণালয়টিকে সাবেক শাসকগোষ্ঠীর দোসরদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করা হয়েছে।

আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ বিধিমালা অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের ক্রয় ও বিল পরিশোধ সংক্রান্ত নথি মন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও সচিব কামরুজ্জামান এককভাবে অনেক ফাইল অনুমোদন করছেন। চিকিৎসক বদলি, ফাইল পাস ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় মোটা অঙ্কের ঘুষ না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখারও অভিযোগ রয়েছে।

এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো রাজশাহী মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প (প্যাকেজ-২)। সর্বনিম্ন দরদাতা ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন হলেও এবং অন্যান্য দরদাতার কারিগরি ও ব্যাংক গ্যারান্টিতে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দিতে চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতা মজিদ অ্যান্ড সন্স-এর ফাইলটি সচিব চার মাস ধরে আটকে রেখেছেন বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য খাতে আবাহনী মাঠের পাশে অফিস পরিচালনাকারী ও ফরিদপুরের বাসিন্দা আফতাব আহমেদ নামে এক প্রভাবশালী ঠিকাদারের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জামাতার সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার আফতাব সচিব হিসেবে যোগদানের প্রথম দিনেই মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরীকে ইউরো মূল্যের ৩ লক্ষ টাকার একটি বিলাসবহুল উপহার প্রদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অতীতে সিএমএসডি ও বিভিন্ন হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার ভুয়া কেনাকাটার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত এই ঠিকাদারি সিন্ডিকেট বর্তমানেও সক্রিয় রয়েছে। সচিবের দপ্তরে প্রায়শই ফাইনালে স্বাক্ষর পেতে ১০ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হয় এবং মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনাও তোয়াক্কা করা হয় না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সচিবের এমন একচ্ছত্র ও স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান সরকারের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং মন্ত্রণালয়টি আবারও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হতে চলেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সচিবের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন