বেতাগীতে থামছেনা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক নতুন চাঁদা নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল
বেতাগী (বরগুনা) প্রতিনিধি
বরগুনার বেতাগীতে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও বিএনপির সাবেক
যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নেছার উদ্দিন খান আওয়মী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই
বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। কিছুতেই থামছেন না আলোচিত ও বির্তকিত এই নেতা।
গত ৫ আগস্টের পর থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে টোল
আদায়, সরকারি জমি দখল করে অবৈধভাবে ঘর উত্তোলন, হুমকি-ধামকি, নিজ দলীয়
নেতাকর্মীদের ভয়-ভীতি দেখানো, মামলা ও কমিটি বাণিজ্যে ও অপকর্মের অভিযোগ
উঠে।
সর্বশেষ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় ঐ নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা নেওয়ার
রোববার রাতে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। শনিবারে করা ঐ ভিডিটিতে সব কথা
স্পস্টভাবে শোনা না গেলেও আজকে যা পারো দিয়ে দেও... নেছার উদ্দিন খানের
এমন বক্তব্য শোনা যায়। আর তার প্রতি উত্তরে ভূক্তভোগির বক্তব্য, টাকা
নাই, টাকা নাই।
দলীয় নির্দেশনা উপেক্ষা সংগঠনবিরোধী নানা কর্মকান্ড করছেন তিনি। এতে
ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ভ’ক্তভোগিরা
করেছেন বেতাগী থানায় ১০টি জিডি ও ১টি মামলা, মানববন্ধন করেন। তাকে নিবৃত
করতে দলীয় শোকজ ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও থেমে থাকছে না তার অনিয়ম।
২০২৫ সালে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর দেওয়া চাঁদাবাজি মামলায় এই
নেতা কারাগাভোগ করেন। ঐ মামলায় নেছার উদ্দিন খানকে আদালতে হাজির করা হলে
বরগুনা দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক এস এম শরিয়াতুল্লাহ জামিন না মজ্ঞুর
করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এতেই শেষ নয়, ২০২৬ সালের গত ২৪ জুলাই উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক
বেতাগী পৌর শহরে সরকারি জমি দখল করে অবৈধভাবে ঘর তোলে। ভ্রাম্যমাণ
আদালতের মাধ্যমে প্রশাসন তা ভেঙ্গে দেয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামীলীগ সরকারের
পতনের পরপরই মো. নেছার উদ্দিন খান তার দলীয়ক্যাডারদের নিয়ে উপজেলার
বিভিন্ন এলাকায় মটরসাইকেল মহড়া দিয়ে জনগনের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে বিশেষ করে
হিন্দু পরিবারকে টার্গেট করে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নানা পদ্ধতিতে
চাঁদাবাজি করে আসছে। যারা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে তাদেরকে মারধর ও কৌশলে
হয়রানি করে। তিনি এসব অপকর্ম আড়াল করতে সম্প্রতি গড়ে তুলছেন উপজেলা
প্রেসক্লাব ও ভূমিহীন সংগঠন সহ নামে একাধিক নব্য প্রতিষ্ঠান। যার সভাপতি
হয়ে গত কয়েক মাসে অর্থের মালিক হয়ে বনে গেছেন সাংবাদিক নেতাও।
মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৫ সালের ৪ মার্চ বেতাগী পৌর টে¤পু
স্ট্যান্ডের তালিকাভুক্ত ইজারাদার ও বাস স্ট্যান্ডের তৌহিদ স্টোরের
স্বত্বাধিকারী মো. খোকন হাওলদারের কাছে নেছার খান তার লোকজন নিযে দোকানে
প্রবেশ করে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেএবং টে¤পু স্ট্যান্ডের ইজারা
বাস্তবায়ন না করার জন্য হুমকীদিয়ে ২ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না
দিলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়।
দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় নেছার খানের নেতৃত্বে গত ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল
বেতাগী বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কে ভূয়া রশিদ তৈরীকরে যানবাহন থেকে
অবৈধভাবে পৌর টোল আদায় শুরু করেন। এ ঘটনায় ইজারাদার খোকন হালাদার বেতাগী
পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করলে তিনি চাঁদা আদায়
বন্ধের নির্দেশ দেন।
কিন্তু নেছার খান ইউএনও’র নির্দেশ অমান্য করে অনৈতিকভাবে চাঁদাবাজি
অব্যহত রাখলে পৌর টে¤পু স্ট্যান্ডেরই ইজারাদার খোকন হাওলাদার বাদী হয়ে
বরগুনা আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন (দ্রুতবিচার) ট্রাইবুনালে উপজেলা
বিএনপিযুগ্ম আহবায়ক ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মো. নেছার উদ্দিন
খানকে আসামি করে চাদাঁবাজীর মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় নেসার উদ্দিন খান
আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে প্রেরন
করেন।
জানা গেছে, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের
আহবায়ক মো. নেছার উদ্দিন খানের চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে বন্ধ ও তার
বিচারের দাবীতে গত ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল সচেতন নাগরিকের ব্যানারে উপজেলা
বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন বিশ্বাস, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক জসিম
উদ্দিন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক ফিরোজ আলম স্বপন, উপজেলা
শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইউনূস সিকদার এবং ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক
সাধারণ সম্পাদক মো. সোবাহানের উপস্থিতিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন কর্মসুচি
পাালন করেন। এসময় বক্তারা চাঁদাবাজির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তার
দ্রুতবিচারের দাবি করে।
তাছাড়াও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক
মো. নেছার উদ্দিন খানের দখলদারিত্ব ও হুমকির বিরুদ্ধে ভুক্তভোগি বেতাগী
পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো: বজলুর রহমান বেতাগী থানায় ১০ টি
সাধারণ ডায়েরী করেন বলে তিনি জানান।
এদিকে দলীয় সুত্রে জানা গেছে, তাকে নিবৃত করতে গত ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল
বরগুনা জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মো. রাজিবুল
ইসলাম সোহেল ও সদস্য সচিব মো. ফয়জুল মালেক সজিব’র নির্দেশে দপ্তরের
দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মো. ইয়াছির রহমান সোয়েব স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে
বেতাগী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মো. নেছার উদ্দিন খানকে দলীয়
শৃঙ্খলাপরিপন্থি কাজে লিপ্ত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার
বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না? তার কারন জানাতে
স্ব-শরীরে বরগুনা জেলা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ৪৮ ঘন্টারমধ্যে জবাবদিতে
বলা হলেও সেই সময় পেরিয়ে যাওয়াতো দুরে থাক বরং একের এক অপকর্ম করে আসলেও
তার বিরুদ্ধে অধ্যাবধি কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে ঐ নেতা আরও
বেপরোয়া হয়ে উঠেন ভ’ক্তভোগিরা এমনই অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ
বাসিন্দা ও দলের একাধিক নেতা ও কর্মিরা ক্ষুব্ধ। তারা যে কোন সময় ফুঁসে
উঠতে পারেন এলাকায় এমনই আশঙ্কাজণক অবস্থা বিরাজ করছে।
পৌরসভাসহ উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের একাধিক স্বেচ্ছাসেবক নেতারা অভিযোগ করেন,
মো. নেছার উদ্দিন খান উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক হওয়ায় ইউনিয়ন
পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি দেয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকার বাণিজ্য করে
তা হাতিয়ে নিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবক দলের এক ইউনিয়নের
আহবায়ক জানান,কমিটি আনার জন্য নেছার খানকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে।
এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে তাদের কাছ থেকে জোড় পূর্বক চাঁদা আদায়
করা হত বলে একাধিক ইউনিয়নের আহবায়কগণ জানিয়েছেন।
নেছার খান এলাকায় বিত্তশালী হিন্দু পরিবারকে টার্গেট করে তাদের কাছে
বিভিন্ন কৌশলে চাঁদা দাবী করে আসে। অনেকে ভয়ে তার চাহিদামত চাঁদা গোপনে
দিয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের উপর নেমে আসে
অত্যাচার। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মামালার আসামী করে। মামলা
থেকে রক্ষা পেতে নেছার খানকে টাকা দিয়ে নামবাদ দেয়ার ব্যবস্থা করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, নেছার আমাদের থেকে নিয়মিত চাঁদা
দাবি করে। না দিলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে যায়। প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের
সমস্যায় পড়তে হয়। এসব চাঁদাবাজি বন্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের ব্যবসা বা
জীবন আরও জটিল করে তোলা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নেছার খান তার এসব অপকর্ম আড়াল করার জন্য সম্প্রতি
বেতাগী উপজেলা প্রেসক্লাব নামে একটি সংগঠন গঠন করে। এ সংগঠনের ব্যানারে
বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজী করার একাধিক অভিযোগ
রয়েছে।
বেতাগী পৌর টে¤পু স্ট্যান্ডের তালিকাভুক্ত ইজারাদার ও বাস স্ট্যান্ডের
তৌহিদ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. খোকন হাওলদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে
বাসস্ট্যান্ডে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি কিন্তু ৫আগস্টে পরে নেছার উদ্দিন
খান সেখানকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করে আসছেন। তার
ভয়ে এখানকার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত থাকেন। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছেন না।
নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, বিএনপির নাম
ব্যবহার করে নেছার উদ্দিন খান চাঁদা বাজি করছেন। বিভিন্ন জনকে হুমকি-ধমকি
দিচ্ছেন। গত ৫ আগস্টের পরে নিরীহ হিন্দুদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা
নিচ্ছেন। বিভিন্নঅপকর্ম করে দলের বদনাম করছেন। দলের উচ্চ পর্যায়ের
নেতাদের কাছে তার বহিষ্কারের দাবি করেন।
তারা আরও অভিযোগ করেন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের
আহ্বায়ক নেছার উদ্দিন খান তার নিজস্ব বাহিনী দ্বারা দলের পদ-পদবি ব্যবহার
করে অফিস-আদালত ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছেন। এতে দলের
ভাবমুর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। পৌর টে¤পু স্ট্যান্ডের ইজারাদার তৌহিদুল স্টোরের
নামে ভূয়া রশিদ ছাপিয়ে নেছার উদ্দিন খান চাঁদা আদায় করেন।
উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক ও সাবেক মেয়র শাহজাহান কবির বলেন, দলের নাম
ব্যবহার করে কোনো অপকর্ম করলে তার দায়ভার দল নেবে না। দলে চাঁদাবাজদের
কোন জায়গা নেই এবং এদের কাউকে আমরা দলের লোক হিসাবে মনে করিনা। সে যেই
হোক দলীয়পরিপন্থী কোনো কাজ করা হলে দলের গঠনতন্ত্র মোতাবেক ব্যবস্থা
নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপিযুগ্ম আহবায়ক ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের
আহবায়ক মো. নেছার উদ্দিন খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন,
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমার জনপ্রিয়তায় ইর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা
অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বেতাগী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হারুন অর বশিদ হাওলাদার জানান,
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে নেছার খানের বিরুদ্ধে চাঁদা নেওয়ার ভিডিও
ভাইরালের বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। এ নিয়ে এখনো কেউ তার কাছে কোন অভিযোগ
করেনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ, সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিএনপি নেতা
রেজাউল করিম নেসার খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বিষয় তার কাছে কেউ লিখিত
অভিযোগ করেনি। তবে মৌখিকভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনছি। অবৈধভাবে বালু
উত্তোলনের ঐ নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা নেওয়ার ভিডিও ভাইরালের বিষয়টি এখনো
আমার চোখে পড়েনি।
ক্যাপশন: এখন যা পারো তা দেও...অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের জন্য বেতাগী
উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদা
নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল ।

