মন্ত্রণালয়কে উপেক্ষা করে দুদক মামলার আসামিকে পিডি নিয়োগ দিলেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী
নিজস্ব প্রতিবেদক
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালা অমান্য করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুর্নীতি মামলার এক আসামিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন এলজিইডির ঢাকা জেলার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়াকে ‘গাজীপুর জেলা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ প্রদান করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক বাছাই কমিটির স্পষ্ট অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও গত ২২ জুন একটি গোপন অফিস আদেশের মাধ্যমে এই বিতর্কিত নিয়োগ দেওয়া হয়, যা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ প্রকল্প থেকে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২০২৫ সালের অক্টোবরে বাচ্চু মিয়া, নির্বাহী প্রকৌশলী সাবের আলী এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী শামস জাভেদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এই মামলার পর বাচ্চু মিয়াকে তাঁর পদ থেকে প্রত্যাহার করে এলজিইডি সদর দপ্তরে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে সংযুক্ত করা হয় এবং বর্তমানে তাঁর বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওএসডি থাকলেও একটি আকর্ষণীয় পোস্টিংয়ের জন্য জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছিলেন বাচ্চু মিয়া। প্রায় তিন মাস আগে প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বাচ্চু মিয়াকে গাজীপুর প্রকল্পের নিয়মিত পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠান। তবে দুদকের সচল মামলা থাকার কারণে মন্ত্রণালয়ের বাছাই কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তাঁর নাম নাকচ করে দেয়। এরপরও দমে না গিয়ে প্রধান প্রকৌশলী আবারও তাঁর নাম সুপারিশ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে একটি মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
সাক্ষাৎকার বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য জানান, বাচ্চু মিয়ার নাম বারবার সুপারিশ করায় কমিটির সদস্যরা গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দুদকের মামলার আসামি কোনো কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে খালাস না পাওয়া পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার কোনো প্রকল্পের প্রধান করা যাবে না। ওই বৈঠকে প্রধান প্রকৌশলী এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
বাচ্চু মিয়ার জন্য নিয়মিত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হয়ে প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন একটি প্রশাসনিক ফাঁকফোকর বেছে নেন। নিজের একক প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি গত ২২ জুন, ২০২৬ তারিখে একটি অভ্যন্তরীণ অফিস আদেশ জারি করেন, যার মাধ্যমে বাচ্চু মিয়াকে প্রকল্প পরিচালকের পদের ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দেওয়া হয়। এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখেন; কারণ নিয়মিত পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও অতিরিক্ত দায়িত্বের বিষয়টি বিভাগীয় প্রধান নিজেই অভ্যন্তরীণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
এই দুর্নীতি মামলার সাথে জড়িত বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার চেষ্টা এলজিইডি প্রশাসনের এবারই প্রথম নয়। এর আগে বাচ্চু মিয়ার সহ-আসামি মো. সাবের আলীকে ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল। এ নিয়ে জাতীয় পত্রিকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করার নির্দেশ দেন, যার ফলে কর্তৃপক্ষ সাবের আলীর বদলি আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয়।
সংশ্লিষ্ট মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, প্রধান প্রকৌশলী অত্যন্ত গোপনে একই দুদক মামলার প্রধান আসামির হাতে একটি বহু কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প তুলে দিয়েছেন, যা প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর তদারকিকে সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল।
এই বিতর্কিত নিয়োগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

