ডার্ক মোড
Monday, 27 July 2026
ePaper   
Logo
ফরিদপুরে নিষিদ্ধ 'চায়না দুয়ারী'র অবাধ ব্যবহারে দেশীয় মৎস্য সম্পদ চরম হুমকির মুখে

ফরিদপুরে নিষিদ্ধ 'চায়না দুয়ারী'র অবাধ ব্যবহারে দেশীয় মৎস্য সম্পদ চরম হুমকির মুখে

মাহবুব পিয়াল, ফরিদপুর

ফরিদপুর জেলাজুড়ে নদী-নালা, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে ক্ষতিকারক ও নিষিদ্ধ 'চায়না দুয়ারী' জালের অবাধ ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন চক্রকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর সাথে সাথে সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, সদরপুর, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা এবং আলফাডাঙ্গাসহ প্রায় সব উপজেলায় এই অবৈধ ফাঁদের বিস্তার ঘটেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে জলাশয়ে এসব ফাঁদ পেতে নির্বিচারে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরা হলেও মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান অভিযান ও কার্যকর পদক্ষেপের চরম অভাব রয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন সমাজ ও পরিবেশ কর্মীরা।

ক্ষেতজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বাঁশ, জাল ও প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে তৈরি এই চায়না দুয়ারী জালগুলো স্থানীয় বিভিন্ন জলাশয়ে পানির স্রোতের মুখে বসানো হয়েছে। পানির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে এমনভাবে এসব ফাঁদ পাতা হয়, যাতে অতি ক্ষুদ্র পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ—সবই আটকা পড়ে। ফলে প্রাকৃতিক প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা হৃদয় মোল্লা বলেন, "চলতি বছর চায়না দুয়ারীর বিরুদ্ধে মৎস্য বিভাগকে কোনো অভিযান চালাতে দেখা যায়নি। নদী-খালে অগণিত ফাঁদ পাতা হয়েছে। এগুলো সরানো না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।"

সালথা উপজেলার রহিম শেখ জানান, "আগে বর্ষার দিনে খাল-বিলে জাল ফেললেই নানা জাতের মাছ উঠত। এখন চায়না দুয়ারীর কারণে মাছের উপস্থিতি তলানিতে ঠেকেছে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া দরকার।"

নগরকান্দার আব্দুল জলিল বলেন, "প্রায়ই প্রকাশ্যে এসব ফাঁদ পেতে রাখা হয়। স্থানীয়রা অভিযোগ করলেও সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিয়মিত অভিযান চললে কেউ এই অন্যায় কাজ করার সাহস পেত না।"

বোয়ালমারী উপজেলার হায়দার মাতুব্বর মন্তব্য করেন, "চায়না দুয়ারীতে কেবল বড় মাছই নয়, রেণু পোনাসহ সব আটকে যায়। এতে ভবিষ্যতে মাছ উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।"

ভাঙ্গা উপজেলার কায়সার খান যোগ করেন, "মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকার প্রতিবছর নানা উদ্যোগ নেয়। তবে চায়না দুয়ারীর মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ বন্ধ করা না গেলে সেসব উদ্যোগের পুরো সুফল মিলবে না।"

আলফাডাঙ্গা উপজেলার কেরামত আলী জোর দিয়ে বলেন, "মৎস্য সম্পদ রক্ষায় কেবল নামকাওয়াস্তে অভিযান চালালে হবে না; যারা বারবার এসব জালের ব্যবহার করছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।"

চরভদ্রাসন উপজেলার সাংস্কৃতিক ও পরিবেশ কর্মী আব্দুস সবুর কাজল চায়না দুয়ারীকে ফরিদপুরের জলাভূমির জন্য এক "নীরব বিপর্যয়" বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "এই অবৈধ জালে ডিমওয়ালা মা মাছ ও মাছের পোনাসহ সব আকারের মাছ আটকে পড়ে প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি ধ্বংস করে দিচ্ছে।"

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারী হলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে পাতানো ফাঁদ, যা সরাসরি পানির স্রোতের মুখে বসানো হয়। এটি পরিণত মাছের সাথে সাথে অপূর্ণাঙ্গ পোনা এবং প্রজননক্ষম মা মাছকে আটকে ফেলে স্বাভাবিক প্রজনন চক্রকে বিকল করে দেয়। বাংলাদেশে এ ধরনের জালের ব্যবহার বহু আগে থেকেই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আইনানুযায়ী, মৎস্য সংরক্ষণ আইনের অধীনে নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ ব্যবহার করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার সাজা হিসেবে জরিমানা থেকে শুরু করে কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবুও সহজে ও একবারে বেশি মাছ পাওয়ার লোভে অনেকে এই অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করে চলেছেন।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, "কেবল মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে চায়না দুয়ারী নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর উৎপাদনের উৎস ও সরবরাহকারী চক্রকে চিহ্নিত করে উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করা প্রাথমিক পদক্ষেপ হওয়া উচিত। তা না করে দু-একটি জাল জব্দ করার সাময়িক অভিযানে স্থায়ী সমাধান আসবে না। বিগত পাঁচ বছরে এ জালের ব্যবহার বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে।"

ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটি (সুজন)-এর সদস্য ও সাংবাদিক হাসানুজ্জামান বলেন, "মাঝে মধ্যে নামমাত্র অভিযান চালিয়ে এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না। জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মৎস্যজীবী সমিতি, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।"

এসব উদ্বেগের বিষয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরীন জাহান বলেন, "আমরা চায়না দুয়ারীর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ জাল অপসারণ করছি। সামনে এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারী যারাই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন