ক্ষুর- কাঁচিতে জীবিকা আধুনিকতার ছোয়ায় লালমনিরহাটে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর প্রায় বিলুপ্ত
মোঃ লাভলু শেখ লালমনিরহাট
ক্ষুঁর- কাঁচিতে জীবিকা, আধুনিকতার ছোয়ায়, ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর প্রায় বিলুপ্ত।
একসময়ের গ্রামবাংলার হাট - বাজারে কেনাকাটার পাশাপাশি চুল- দাঁড়ি কাটিয়ে নেওয়া ছিল সাধারণ দৃশ্য ।কাঠের পিঁড়া, ক্ষুঁর -কাঁচি, চিরুনি ও ছোট্ট আয়না নিয়ে হাটে বসতেন ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দররা। সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক সেলুনের বিস্তার ও মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে এ পেশার ধরন।
লালমনিরহাটের বিভিন্ন হাটে একসময়ে বংশপরম্পর অনেকেই ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর হিসেবে কাজ করতেন। কৃষক, শ্রমিকসহ নিম্নআয়ের মানুষের কাছে কম- খরচে চুল- দাঁড়ি কাটার জন্য তাঁদের সেবা ছিল সহজলভ্য । বর্তমানে আধুনিক সেলুনের সংখ্যা বাড়ায় এবং নতুন প্রজন্মের অনেকেই অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ায় হাটকেন্দ্রিক এ পেশার পরিসর আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
লালমনিরহাট শহরের ১ নং ওয়ার্ডের
স্থানীয় নরসুন্দর মোঃ মোজাম্মেল হক ও মোঃরফিকুল ইসলাম জানান, তাঁদের পরিচিত অনেকেই বংশপরম্পরায় এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁদের সন্তানদেরও বেশিরভাগই পূর্বপুরুষের পেশায় আগ্রহী নন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী হাটের প্রবীণ নরসুন্দর শ্রী পরিমল চন্দ্র শীল প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। তিনি বলেন, আগে কাজের চাহিদা বেশি ছিল। এখন কমেছে। আয়ও আগের মতো নেই। নতুন প্রজন্ম কাঠের পিঁড়া, ক্ষুঁর - কাঁচি ও চিরুনি নিয়ে হাটে বসে এ পেশায় আসতে আগ্রহী নন।
একই হাটে বংশপরম্পরায় এ পেশা ধরে রেখেছেন বাবুল চন্দ্র শীল। তিনি বলেন, আগে হাটে মানুষের ভিড় বেশি থাকত, কাজও পাওয়া যেত। এখন আধুনিক সেলুন বেড়ে যাওয়ায় কাজ কমেছে। সারাদিন কাজ করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ওই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা সুযোগ পেলে একটি ছোট দোকান নিয়ে স্থায়ীভাবে কাজ করতে চাই।
তবে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের সেবা এখনও কিছু শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে
গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক কম- খরচে চুল- দাঁড়ি কাটার সুযোগ থাকায় তাঁরা এখনও হাটের নরসুন্দরদের সেবা নিয়ে থাকেন।
বড়বাড়ী হাটের গ্রাহক আনিসুর রহমান বলেন, এভাবে চুল- দাঁড়ি কাটাতে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। পরিচিত পরিবেশে ভালোও লাগে, খরচও তুলনামূলক কম।
লালমনিরহাট নরসুন্দর সমিতির সভাপতি শ্রী দিনোনাথ শীল বলেন, ওই পেশার সঙ্গে গ্রামবাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। যারা এখনও এ পেশায় আছেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এতে তাঁরা পেশাটিকে আধুনিকভাবে এগিয়ে নিতে পারবেন।
মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সংস্কৃতিব্যক্তিত্ব মো. মোঃ শফিকুর রহমান বলেন, ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অংশ। সময়ের পরিবর্তনে এ পেশার রূপ বদলে গেছে, গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিবর্তনেরও প্রতিফলন হয়েছে।
লালমনিরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোঃ ফজলুল হক বলেন, নিম্নআয়ের ও অসচ্ছল পেশাজীবীদের স্বাবলম্বী করতে সরকার বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। যোগ্যতা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদেরও এসব কর্মসূচির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। আগ্রহীরা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহাঃ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, আধুনিকতার প্রভাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। কেউ সহযোগিতার আবেদন করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।

