১৯ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক, ভারপ্রাপ্তদের কাঁধে পাঠদান ও দাপ্তরিক চাপ
মো. শাহিনুর ইসলাম (শাহিন) ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় ৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৯টিতেই নেই নিয়মিত প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কোনোরকমে চালানো হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষা পাঠদান। এছাড়া ৯টি বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বে এবং মাত্র ১৯টিতে রয়েছেন পূর্ণাঙ্গ বা সরাসরি প্রধান শিক্ষক। সব মিলিয়ে ২৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক বা চলতি দায়িত্বের শিক্ষক থাকলেও ১৯টি বিদ্যালয় পুরোপুরি অভিভাবকহীন (প্রধান শিক্ষকশূন্য) অবস্থায় রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসসূত্রে জানা গেছে, ক্ষেতলাল উপজেলায় ৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ২০০ জন। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৪৭টি থাকলেও সরাসরি কর্মরত রয়েছেন ১৯ জন এবং চলতি দায়িত্বে রয়েছেন ৯ জন। ফলে ১৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকের ২৫৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৩৮ জন, অর্থাৎ সহকারী শিক্ষকেরও ১৮টি পদ ফাঁকা রয়েছে।
নথিপত্র ও তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নিয়মিত ও চলতি দায়িত্ব মিলিয়ে যে ২৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক বা চলতি দায়িত্বে শিক্ষক রয়েছেন সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য,
তিলাবদুল, পাঠানপাড়া, কৃষ্ণনগর, শিশির নাজিরপাড়া, রোয়াইর, নিশ্চিন্তা, ছোটতারা, ক্ষেতলাল মডেল, ইটাখোলা, সরাইল, মহব্বতপুর, সমন্তাহার, হিন্দা, হাটশহর, গোলাহার, তেলাল কুসুম শহর, নশিরপুর দৌলত গাজী, আখলাস শিবপুর শ্যামপুর, পৌলঞ্জ-পাঁচুইল, আলমপুর, বানিয়াচাপড়, বানাইচ, বালিকা, মহেশপুর, দৌলতপুর, হোপপীরহাট, শাখারঞ্জ চৌধুরীপাড়া, মিনিগাড়ী ১৫০০।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলা ১৯টি বিদ্যালয় হলো, গণমঙ্গল, বড়তারা, আটিদাশড়া, তালশন,
ইকড়গাড়া, জিয়াপুর, মামুদপুর, আয়মাপুর, বিনাই, মাটিহাঁস, নওটিকা কেশুরতা, ধাপশুন্ডা শিবপুর, উত্তর হাটশহর,
বারইল, পশ্চিম দুর্গাপুর, আটিমুকুল, কোড়লগাড়ী, মির্জাপুর ফেরসা ১৫০০ এবং বেজার ১৫০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
প্রধান শিক্ষক না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজ, বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রতিবেদন তৈরি, প্রশাসনিক সভা, সহকর্মীদের সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের নানা দাপ্তরিক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও করতে হচ্ছে, যা চরম মানসিক ও শারীরিক চাপের সৃষ্টি করছে।
বেজার ১৫০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী রানা চৌধুরী বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রশাসনিক কাজের চাপ বহুগুণ বেড়েছে। এর পাশাপাশি নিজের নির্ধারিত ক্লাসগুলোও নিতে হয়। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যাতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় কোনো ব্যঘাত না ঘটে। তবে একজন নিয়মিত প্রধান শিক্ষক থাকলে পাঠদান ও প্রশাসনিক কাজ আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের মূল কাজ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা। কিন্তু প্রশাসনিক কাজ, উপবৃত্তি, দাপ্তরিক চিঠিপত্র ও মিটিং সামলাতেই দিনের অধিকাংশ সময় চলে যায়। একদিকে ক্লাসে ঠিকমতো সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, অন্যদিকে প্রশাসনিক দায়িত্বের জবাবদিহিতাও সামলাতে হয়। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি না দিলে শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে ক্ষেতলাল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজিজুল ইসলাম বলেন, সারা দেশের ন্যায় আমাদের উপজেলায়ও কিছু পদ শূন্য রয়েছে। তবে সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে এই শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের প্রক্রিয়া চলছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্তদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জেছের আলী জানান, ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আমরা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি এবং কোনো সমস্যা হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে সমাধান করছি। ইতিমধ্যে শূন্য পদের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। পদগুলো পূরণ হয়ে গেলে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম আরও বেশি গতিশীল হবে।

