১৮ শ্রমিকের মৃত্যু, তবুও থামছে না কয়লা চোরাচালান সীমান্তের ওপারে মৃত্যুফাঁদ, জবাবদিহি করবে কে?
হাবিব সরোয়ার আজাদ
গত এক বছরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের লাকমা, লালঘাট, চারাগাঁও ও কলাগাঁও সীমান্তের ওপারে অবৈধভাবে কয়লা আনতে গিয়ে কোয়ারি ধসে কয়লা, মাটি ও পাথর চাঁপায় ইউনুছ আলীসহ ১৮ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
একটি-দুটি নয়—একের পর এক মৃত্যু। অথচ প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুগুলো কি শুধু অপমৃত্যুর মামলা, লাশ উদ্ধার আর ময়নাতদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
মানুষগুলো কার প্ররোচনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পেরোয়? কারা তাদের পাঠায়? কারা ওপারে কয়লা উত্তোলনের ব্যবস্থা করে? এপারে কারা সেই কয়লা গ্রহণ করে, পরিবহন করে, মজুত করে এবং বিক্রি করে? আর এই বিপজ্জনক অবৈধ বাণিজ্যের মূল অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী কারা?
সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছে সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি। চোরাচালানবিরোধী অভিযান, কয়লা ও অন্যান্য পণ্য জব্দ, মামলা—এসব কার্যক্রমও চলছে। দায়িত্ব পালনের সময় বিজিবি সদস্যদের বাধা বা হামলার মুখে পড়ার ঘটনাও রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন আরও কঠিন—এত অভিযান, এত জব্দ, এত মামলা সত্ত্বেও চোরাচালানের মূল প্রবাহ বন্ধ হচ্ছে না কেন?
শুধু শ্রমিক বা বাহক আটক করে এই সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে না। বাহকের পেছনের হোতাদের খুঁজে বের করতে হবে। কারা সীমান্তের পথ নিয়ন্ত্রণ করে, কারা কয়লা সংগ্রহ ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত, কারা টাকা লেনদেন করে—পুরো নেটওয়ার্ক তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হলে শুধু “অপমৃত্যু” হিসেবে ফাইল বন্ধ করে দিলে চলবে না। যদি সেই মৃত্যুর সঙ্গে চোরাচালানের যোগসূত্র থাকে, তাহলে চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধেও কার্যকর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ কাজ কোনো একক সংস্থার নয়। বিজিবি, পুলিশ, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে পুরো চোরাচালান নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে দিতে হবে।
১৮টি প্রাণ চলে গেছে। এরপরও যদি একই পথে শ্রমিক যায়, একইভাবে মৃত্যু ঘটে এবং একইভাবে কয়লা আসে—তাহলে শুধু অভিযান দিয়ে দায়িত্ব পালনের দাবি কতটা অর্থবহ, সেই প্রশ্ন উঠবেই।
আর কত মৃত্যু হলে সীমান্তের এই মৃত্যুফাঁদ ও কয়লা চোরাচালানের মূল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সত্যিকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
লক্ষ্য শুধু কয়লা জব্দ নয়—লক্ষ্য হতে হবে চোরাচালানের মূল হোতাদের শনাক্ত করে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।
লেখক :
গণমাধ্যম কর্মী, মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সংগঠক—
ই-মেইল: smhsazadj@gmail.com

