গ্রিনকার্ডে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতি: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
হেমায়েত হোসেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিনকার্ড পেতে ইচ্ছুক অধিকাংশ বিদেশিকে এখন নিজ দেশে ফিরে আবেদন করতে হবে—ট্রাম্প প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জীবন ওলটপালট করে দিতে পারে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা —ইউএসিআইএস এক নীতি স্মারক জারি করে জানায়, অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরতদের জন্য ‘স্ট্যাটাস সমন্বয়’ বা অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস প্রক্রিয়া বন্ধ করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী ও পর্যটক—যারাই স্থায়ী বসবাসের জন্য গ্রিনকার্ড চান—তাদের স্বদেশে ফিরে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে কনস্যুলার প্রসেসিং করতে হবে।
ইউএসিআইএস মুখপাত্র জ্যাক কাহলার বলেন, এ পরিবর্তন “আইনের মূল উদ্দেশ্য ফিরিয়ে আনা” এবং অস্থায়ীভাবে আসা ব্যক্তিদের গ্রিনকার্ড পাওয়ার পথকে ‘ফাঁকফোকর’ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করার জন্য। কেবল ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে আবেদন গ্রহণ করা হবে, তাও মামলাভিত্তিক।
শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি প্রভাব :
এ নীতি সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে এফ-১ ভিসার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের, যাদের অনেকেই নিজ দেশের সরকারি বা বেসরকারি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসেন। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজারো শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। পড়াশোনার পর অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং ও পরে চাকরির মাধ্যমে গ্রিনকার্ডের আশায় থাকেন অনেকে।
নতুন নিয়মে তাদের পড়াশোনা বা চাকরি মাঝপথে থামিয়ে দেশে ফিরতে হবে। এরপর ঢাকা বা অন্য কোনো কনস্যুলেটে গ্রিনকার্ড আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হতে মাস থেকে বছর লেগে যেতে পারে। এতে চলমান গবেষণা, চাকরির প্রস্তাব বা পারিবারিক জীবন—সবই হুমকিতে পড়বে।
“শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী বা পর্যটকরা অল্প সময়ের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। আমাদের ব্যবস্থা এভাবেই তৈরি—তাদের সফর শেষে ফিরে যেতে হবে। এ সফর যেন গ্রিনকার্ড পাওয়ার প্রথম ধাপ না হয়,” বলেন কাহলার।
অভিবাসন অধিকারকর্মীরা বলছেন, এ পরিবর্তন আইন মেনে চলা ভিসাধারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ ফেলবে। শরণার্থী সহায়তা সংস্থা হাইয়াস জানায়, নীতিটি পাচার ও নির্যাতনের শিকার শিশুদেরও তাদের পালিয়ে আসা বিপজ্জনক দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করবে।
একের পর এক কড়াকড়ি:
গ্রিনকার্ডের এ নতুন নিয়ম ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আরোপিত একাধিক বিধিনিষেধের সর্বশেষ ধাপ। গত বছর শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও গণমাধ্যম ভিসার মেয়াদ কমানো হয়। উচ্চদক্ষ কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসায় ১ লাখ ডলার ফি আরোপ ও এফ, এম, জে ভিসাধারীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম যাচাই জোরদার করা হয়।
প্রশাসনের যুক্তি, এতে ইউএসিআইএস-এর সম্পদ প্রাকৃতিকীকরণ ও অপরাধ-নির্যাতনের শিকারদের ভিসার মতো অগ্রাধিকার খাতে ব্যয় হবে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বলে, এ পদক্ষেপ “গ্রিনকার্ড প্রত্যাখ্যাত হয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে সরানোর প্রয়োজন” কমাবে।
অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা :
বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা বাংলাদেশি ও অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অনিশ্চয়তা এখনই শুরু। অনেকে শিক্ষার্থী ভিসা থেকে চাকরি, পরে গ্রিনকার্ড—এই পথ ধরে এগোনোর প্রত্যাশা নিয়ে আসেন। নতুন নিয়মে ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’র সংকীর্ণ ছাড়পত্র ছাড়া সেই পথ প্রায় বন্ধ।
আইনি চ্যালেঞ্জ অনিবার্য বলে মনে করা হচ্ছে। সাবেক ইউএসিআইএস কর্মকর্তারা জানান, বছরে প্রায় ১০ লাখ গ্রিনকার্ড আবেদনকারীর অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে স্ট্যাটাস সমন্বয় করেন।
আদালত বা কংগ্রেস হস্তক্ষেপ না করা পর্যন্ত বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সামনে দুটি পথ: পড়াশোনা থেকে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে দেশে ফেরা, নয়তো গ্রিনকার্ডের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নতুন নিয়মে হতাশ। তাদের আশঙ্কা, এতে একাডেমিক জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

