শান্তির টেবিলে ছায়াযুদ্ধের ছক
ফকর উদ্দিন মানিক
ইসলামাবাদের টেবিলটা নাকি খুব শক্ত কাঠের। ইতিহাসের অনেক চুক্তি, অনেক ভাঙা প্রতিশ্রুতি, অনেক গোপন হাসি আর চাপা রাগ সে টেবিল আগেও সহ্য করেছে। কিন্তু এবার যেন সে নিজেই একটু ক্লান্ত। কারণ টেবিলে বসেছিল দুই পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী—একজন বিশ্বমঞ্চের ঘোষিত পরিচালক, আরেকজন চিরকালীন অভিনেতা যাকে পরিচালক কখনো নায়ক হতে দেয় না, আবার পুরোপুরি খলনায়ক বলেও থামতে পারে না।
শান্তি চুক্তির আলোচনা ভেস্তে গেছে—এ খবরটি আসলে নতুন কিছু নয়। নতুন হলো, এই ব্যর্থতাকে সবাই খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছে। যেন এটাই ছিল স্বাভাবিক পরিণতি। যেন আলোচনার শুরুটাই ছিল একটি অভিনয়, যার শেষ দৃশ্য আগে থেকেই লেখা।
এই নাটকে কূটনীতি এক ধরনের থিয়েটার। এখানে সংলাপগুলো শোনায় খুব মানবিক—স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক শান্তি, পারস্পরিক সম্মান—কিন্তু মঞ্চের পেছনে চলছে অস্ত্রের হিসাব, তেলের দাম, আর প্রভাব বিস্তারের সূক্ষ্ম খেলা। ইসলামাবাদ শুধু মঞ্চ দিয়েছিল; নাটকটা অন্য কোথাও লেখা।
আসলে এই ব্যর্থতার মধ্যে সবচেয়ে বড় সাফল্য লুকিয়ে আছে—অস্থিরতাকে টিকিয়ে রাখার সাফল্য। কারণ শান্তি মানে স্থিরতা, আর স্থিরতা মানে অনেকের জন্য ব্যবসা বন্ধ। যুদ্ধ না থাকলে অস্ত্র বিক্রি কমে, উত্তেজনা না থাকলে রাজনৈতিক বক্তব্যের ধার ভোঁতা হয়, আর সংকট না থাকলে মধ্যস্থতাকারীদের গুরুত্ব কমে যায়।
এই যে আলোচনার ভাঙন, এর পরের দৃশ্য আমরা আগেও বহুবার দেখেছি। কোথাও একটি ড্রোন উড়ে যাবে, কোথাও একটি তেল ট্যাংকারে আগুন লাগবে, কোথাও একটি অচেনা গোষ্ঠী দায় স্বীকার করবে—আর পর্দার আড়ালে বড় খেলোয়াড়রা নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করবে। এই খেলায় সরাসরি যুদ্ধ খুব কমই হয়, কারণ সরাসরি যুদ্ধের দাম বেশি। বরং ছায়াযুদ্ধ—যেখানে আঘাত লাগে, কিন্তু আঙুল দেখানো যায় না—সেটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
ইসলামাবাদের আলোচনার ব্যর্থতা তাই আসলে একটি নতুন চক্রের সূচনা। এখানে প্রতিটি পক্ষ নিজের ব্যর্থতাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে নৈতিকভাবে সঠিক প্রমাণ করতে চাইবে। এক পক্ষ বলে -তারা ইতিবাচক থাকা সত্ত্বেও অন্যরা আন্তরিক ছিল না। অন্য পক্ষ বলে তারা নিজেদের অবস্থান আগেই পরিষ্কার করেছিল, কিন্তু অন্যরা চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছে। ফলে সত্য কোথাও মাঝখানে পড়ে থাকে , যাকে কেউ তুলতে যায় নাই ।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে মজার বিষয় হলো—শান্তির ভাষা যত বেশি উচ্চারিত হয়েছে , যুদ্ধের সম্ভাবনাও তত সূক্ষ্মভাবে বেড়ে গেছে । কারণ শান্তি এখানে লক্ষ্য নয়, বরং একটি কৌশল। আলোচনার টেবিল আসলে সময় কেনার একটি উপায়। কেউ সময় কিনে অস্ত্র মজুত করে, কেউ সময় কিনে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়, কেউ সময় কিনে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের ভূমিকা যেন এক মধ্যস্থতাকারী চায়ের দোকানদারের মতো—যে দুই পক্ষকে বসার জায়গা দেয়, চা পরিবেশন করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝগড়া হলে দোকানটাই ভাঙচুরের ঝুঁকিতে পড়ে। ইসলামাবাদ চেষ্টা করেছিল একটি নিরপেক্ষ মঞ্চ হতে, কিন্তু এই ধরনের সংঘাতে নিরপেক্ষতা অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। বড় শক্তিগুলো নিরপেক্ষতাকে সম্মান করে না; তারা সেটাকে ব্যবহার করে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে নতুন খেলোয়াড়দের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। কেউ নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরবে, কেউ অর্থনৈতিক বিকল্প প্রস্তাব করবে, কেউ আবার নিরাপত্তার নামে নতুন জোট গড়বে। ফলে সংঘাতের পরিধি ছোট না হয়ে বরং আরও বড় হয়।
এই পুরো ঘটনাকে যদি একটি দাবার খেলার সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে দেখা যাবে—রাজা-রানীরা খুব কমই সরাসরি মুখোমুখি হয়। বরং প্যাদা, ঘোড়া, নৌকা—এই ছোট ঘুঁটিগুলোর মধ্যেই আসল লড়াই চলে। ইসলামাবাদের ব্যর্থতা সেই প্যাদাদের জন্য একটি নতুন নির্দেশনা—কোথায় এগোতে হবে, কোথায় আঘাত করতে হবে, কোথায় থামতে হবে।
কিন্তু এই দাবার বোর্ডের বাইরে যে মানুষগুলো আছে—তাদের কথা কে ভাবছে? প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা মানে একটি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন কষ্ট, প্রতিটি উত্তেজনা মানে একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়া। কিন্তু এই মানবিক দিকটি কূটনীতির আলোচনায় খুব কমই জায়গা পায়। কারণ মানুষের কষ্ট দিয়ে রাজনীতি করা সহজ, কিন্তু সেই কষ্ট দূর করা কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—শান্তি কি সত্যিই কেউ চায়? নাকি শান্তির আলোচনাই আসল লক্ষ্য, যেখানে সবাই নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার সুযোগ পায়? যদি শান্তি সত্যিই লক্ষ্য হতো, তাহলে এতবার ব্যর্থতার পরও একই পদ্ধতিতে বারবার চেষ্টা করা হতো না। বরং নতুন পথ খোঁজা হতো, নতুন আস্থা তৈরি করার চেষ্টা হতো। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, অস্থিরতাই এখানে স্থায়ী কাঠামো।
এই অস্থিরতার রাজনীতিতে নৈতিকতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। শক্তির ভাষা যত জোরালো হচ্ছে, যুক্তির ভাষা তত দুর্বল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা—কে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কে কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। আর এই প্রতিযোগিতায় শান্তি একটি স্লোগান, বাস্তবতা নয়।
তবুও ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—অতল অস্থিরতার ভেতর থেকেও কখনো কখনো শান্তির পথ তৈরি হয়। যে টেবিলে আজ ব্যর্থতার গল্প লেখা হলো, সেখানেই হয়তো আগামী দিনে নতুন কোনো আস্থার সূচনা হতে পারে। কারণ সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, তার ক্লান্তিও তত গভীর হয়—আর সেই ক্লান্তিই একসময় পক্ষগুলোকে বাস্তব সমাধানের দিকে ঠেলে দেয়।
সম্ভবত ভবিষ্যতের শান্তি আসবে বড় ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং ছোট ছোট আস্থা-নির্মাণের পদক্ষেপ থেকে—একটি সীমিত সমঝোতা, একটি মানবিক উদ্যোগ, একটি নীরব সমন্বয়। হয়তো বড় শক্তিগুলোর হিসাবের বাইরে, মানুষের প্রয়োজনই একসময় কূটনীতিকে নতুন পথে হাঁটতে বাধ্য করবে।
ইসলামাবাদের টেবিল তাই এখনো খালি পড়ে আছে—কিন্তু সেটি চিরকাল খালি থাকবে না। কোনো এক সময় আবার সেখানে কিংবা অন্য কোথাও বসা হবে, আবার কথা হবে। পার্থক্য শুধু এই—সেই কথোপকথন যদি সত্যিকার অর্থে মানুষ ও স্থিতিশীলতার কথা ভাবতে শেখে, তবেই এই যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই পুরো ঘটনাটি আমাদের একটি পুরনো সত্যই মনে করিয়ে দেয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেকটা নদীর স্রোতের মতো। উপরে শান্ত দেখালেও নিচে ভয়ংকর ঘূর্ণি লুকিয়ে থাকে। কিন্তু নদী যেমন শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে মিশে যায়, তেমনি সংঘাতের ধারাও একসময় প্রশমিত হতে বাধ্য। প্রশ্ন শুধু—সেই শান্তির পথ আমরা কত দ্রুত খুঁজে পাই।
ইসলামাবাদের ব্যর্থতা তাই শুধু একটি আলোচনার ভাঙন নয়; এটি একটি চলমান নাটকের নতুন দৃশ্য। তবে সেই নাটকের শেষ দৃশ্য এখনো লেখা হয়নি—আর সেই অজানা শেষের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় আশাবাদ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজচিন্তক
ইমেইল: fokoruddincse@gmail.com

