ডার্ক মোড
Wednesday, 02 September 2026
ePaper   
Logo
রূপপুর সঞ্চালন লাইনে ক্ষতিপূরণ না দিয়ে কাজ: ট্রান্সরেইল লাইটিংয়ের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

রূপপুর সঞ্চালন লাইনে ক্ষতিপূরণ না দিয়ে কাজ: ট্রান্সরেইল লাইটিংয়ের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (আরএনপিপি) উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্যে নির্মিত সঞ্চালন লাইন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই কাজ এগিয়ে নেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।

একই সাথে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড’ (সংবাদে উল্লেখিত ট্রান্সট্রেল লাইটিং) এবং এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর অমরিক সিংয়ের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জমি ও গাছপালার ক্ষতিপূরণ প্রদান, নির্মাণের মান এবং কর পরিষদে অনিয়ম বিস্তারিত তুলে ধরে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অভিযোগ দায়েরের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—প্রকল্পে ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, তার কত অংশ ছাড় করা হয়েছে এবং কতটুকু প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছেছে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্পের সম্পূর্ণ আর্থিক নথি এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণের তালিকা নিরীক্ষা করলেই কেবল এর সঠিক উত্তর মিলবে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রায় ৪৬৪ কিলোমিটার ৪৪০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। দ্রুত বাস্তবায়নের স্বার্থে পুরো প্রকল্পকে কয়েকটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০২ কিমি রূপপুর-বগুড়া লাইন, ১৪৪ কিমি রূপপুর-গোপালগঞ্জ লাইন, ১৪৭ কিমি রূপপুর-ঢাকা লাইন এবং ৫১ কিমি আমিনবাজার-কালিয়াকৈর লাইন।

এছাড়া নদী পারাপারের জন্য পৃথক গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যার মধ্যে পদ্মা নদীর পারাপারে প্রায় ছয় কিলোমিটার এবং যমুনা নদীর পারাপারে সাত কিলোমিটার অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের আওতায় প্রধান অংশের মধ্যে রয়েছে ৬০ কিমি রূপপুর-বাঘাবাড়ী লাইন এবং ১৪৫ কিমি রূপপুর-ধামরাই লাইন।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)-র সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন সঞ্চালন প্রকল্পে একাধিক বৃহৎ ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যার মধ্যে ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড, لارসেন অ্যান্ড টুব্রো লিমিটেড (এল অ্যান্ড টি) এবং কেইসি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড অন্যতম।

দুদকে জমাকৃত অভিযোগ অনুযায়ী, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত প্রায় ৮২.৫ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের সময় জমি ব্যবহার এবং গাছপালা কাটার কারণে অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেছেন, জমির মালিক ও গাছপালার মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও অনেকে এখনও কোন অর্থ পাননি।

অভিযোগে বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নাম নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন ফুলচান, মো. নবী, সুমা আক্তার এবং আদুরী। অভিযোগকারীদের দাবি, অনুরূপভাবে শত শত মানুষ ক্ষতিপূরণের টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, কাজ শুরুর সময় ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও সঞ্চালন লাইন ও টাওয়ার নির্মাণের কাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রে শেষ বা শেষের দিকে পৌঁছালেও তাদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

বর্তমানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষতিপূরণ তহবিলের হিসাব। মোট বরাদ্দকৃত অর্থ, ছাড় করা পরিমাণ, বিতরণের মাধ্যম এবং কতজন ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন সেই সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ পেলে অভিযোগের পেছনের প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হতে পারে।

অভিযোগে জমি ব্যবহারের অনুপযুক্ত ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের জন্য তাদের জমি ব্যবহার করা হলেও ক্ষতিপূরণ পাবেন কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। তারা অভিযোগ করেন, জমি ও গাছপালার তথ্য সংগ্রহ করা হলেও কখন ও কীভাবে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়া হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দুদকের অভিযোগে সঞ্চালন টাওয়ারের কারিগরি গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু কিছু এলাকায় নির্ধারিত গভীরতার চেয়ে কম গভীরতায় পাইলিং করা হয়েছে এবং নিম্নমানের রড ও অপর্যাপ্ত সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ যাচাই করতে অনুমোদিত প্রকল্প নকশা, বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ), পাইলিং রেকর্ড এবং মালামালের পরীক্ষা প্রতিবেদন নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সাথে সম্পর্কিত সঞ্চালন লাইনের কারিগরি মানের মূল্যায়নে এটি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্রে ভারতীয় ঠিকাদার ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেডের নানা কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি সূত্রের দাবি, প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও লেনদেন সন্দেহজনক এবং বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং লেনদেন, বৈদেশি অর্থ প্রদান ও প্রকল্পের আর্থিক নথি তদন্ত করা প্রয়োজন।

রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সমন্বিত করার জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। পিজিসিবি কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলেও সঞ্চালন লাইন ও প্রয়োজনীয় গ্রিড অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের প্রকাশিত বিভিন্ন নথিতে ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেডকে দেশের একাধিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সংক্রান্ত সরকারি নথিতেও এই প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পিজিসিবির বার্ষিক প্রতিবেদনে ট্রান্সরেইলকে একটি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ঠিকাদার উল্লেখ করে ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে এবং প্রকল্প সমাপ্তির নির্ধারিত সময় সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ট্রান্সরেইল বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও কমিশনের বিনিময়ে প্রকল্পের কার্যাদেশ হাসিল করেছিল। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিগত সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতেন বলে দাবি করা হয়। তবে রাজনৈতিক সুবিধা বা কমিশনভিত্তিক কার্যাদেশের অভিযোগগুলো স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমেই যাচাই করা সম্ভব।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ বাজেটের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা উচিত। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি এবং অস্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্নীতির পথ তৈরি করতে পারে, তাই এ ধরনের উদ্যোগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

জাতীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ সরকারি ও বৈদেশিক তহবিল জড়িত, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতের সঞ্চালন অবকাঠামোর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলস্বরূপ, ট্রান্সরেইলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; এটি রাষ্ট্রের তহবিলের যথাযথ ব্যবহার, ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নির্মাণ মান এবং জাতীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তার সাথে জড়িত।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, একটি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ তহবিলের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বের করতে হবে—কত টাকা বরাদ্দ ছিল, কত ছাড় করা হয়েছিল এবং কত টাকা প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছেছে। এই হিসাব উন্মোচিত হলেই ট্রান্সরেইলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন