নতুন চাপে অর্থনীতি: প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
নিজ্বস প্রতিনিধি
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি—সব মিলিয়ে বাজার ব্যবস্থায় এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তা থেকে শিল্প উদ্যোক্তা পর্যন্ত সব স্তরে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে চাপ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সরকার বলছে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে নতুন চাপ তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, উৎপাদন খাতে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত (এসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের জন্য বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, ফলে কিছু ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এতে করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা শিল্প ও গৃহস্থালি উভয় খাতেই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খান বাংলানিউজকে বলেন, জ্বালানির দাম সমন্বয় অনেক আগেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু যখন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলো, তখন দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে চাপে রয়েছে। বিনিয়োগ স্থবিরতা, নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের আয়ের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এই সময়টিকে মূল্যবৃদ্ধির জন্য অনুকূল বলা যায় না।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদন খাতে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি ব্যবহারের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্য সরবরাহের খরচও বাড়বে। ফলে সামগ্রিকভাবে দ্রব্যমূল্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
মাহফুজ কবির খান আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি আবার দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কিছু বাস্তব কারণও তুলে ধরা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল। এই ভর্তুকির চাপ বহন করা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর শর্ত পূরণও এই সিদ্ধান্তের একটি কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভর্তুকি কমানো এবং জ্বালানি খাতে সংস্কার আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে চাপ কমানো জরুরি। পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা এবং নগদ প্রণোদনা বাড়ানো হলে তারা এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কিছুটা সামাল দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে বিদ্যমান তালিকা ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদে তিন থেকে চার মাসের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালুসহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানির দাম পুনরায় সমন্বয়ের মাধ্যমে কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও পেট্রোল পাম্পের মালিক হেলাল উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং ভোক্তাদের অসহিষ্ণু আচরণের কারণে দেশের ব্যবসায়ীরা এখন চরম চাপে রয়েছেন। পরিস্থিতি এমন যে, বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনার চেয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় করা উচিত। তবে দেশে দাম বাড়লেও কমার ক্ষেত্রে সেই অনুপাতে সমন্বয় হয় না, যা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। এছাড়া তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে খুচরা বাজারেও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। লিটারে ১৫-২০ টাকা বাড়লে পণ্যের দামে সামান্য প্রভাব পড়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এর পেছনে বাজার মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হেলাল উদ্দিন বলেন, পেট্রোল পাম্পে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অনেক ব্যবসায়ী পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে পারেন। কারণ প্রতিদিন ঝগড়া করে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সরবরাহ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের ওপর এর চাপ বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা হ্রাস পেতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সঠিক নীতিগত পদক্ষেপ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব।

