জ্বালানি লোডিংয়ে প্রস্তুত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
পাবনা প্রতিনিধি
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্লাবে নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন শ্রম, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জটিল সব কারিগরি ধাপ পেরিয়ে অবশেষে মিলেছে কাঙ্ক্ষিত ‘কমিশনিং লাইসেন্স’।
মঙ্গলবার পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পথ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারি এবং নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করায় ১৬ এপ্রিল রূপপুর কর্তৃপক্ষকে পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
কোভিড মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সরকারের দৃঢ়তায় এ মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
চার দিন আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, মঙ্গলবার বিকালে প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হবে। এটি দেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করতে অন্তত ৪৫ দিন লাগবে।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, জ্বালানি লোডিংয়ের তিন মাসের মধ্যে অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা অগাস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে এখান থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এ কেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
২০১৭ সালে কাজ শুরু হওয়ার পর নিরাপত্তা প্রটোকল ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচি বেশ কয়েকবার সংশোধন করা হয়।
জ্বালানি লোডিং অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আযাদ, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধি এবং রুশ সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
উৎপাদনের প্রাথমিক এ প্রক্রিয়াকে প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলছেন পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শৌকত আকবর। তার মতে, ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাধ্যমে দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত যাত্রা; যেখানে চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু হয়।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান বলেন, “৫৯ জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অপারেটিং লাইসেন্স লাভ করেছেন। বর্তমানে প্রকল্পে পাঁচ হাজার রুশ ও ২০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। তবে ধাপে ধাপে কেন্দ্রটি পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব দেশি বিশেষজ্ঞদের হাতে হস্তান্তর করা হবে।”
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক প্রীতম কুমার দাস বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য পরমাণু বিদ্যুৎ অপরিহার্য। তবে এটি স্পর্শকাতর প্রকল্প হওয়ায় আইএইএয়ের নির্ধারিত প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সময় কিছুটা বেশি লাগলেও তা ইতিবাচক।
জ্বালানি লোডিংকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বিষয়ে ধারণা দিতে এর মধ্যে রূপপুর সংলগ্ন চরসাহাপুরে উঠান বৈঠকের আয়োজন করে পরমাণু শক্তি কমিশন। সেখানে প্রকল্প পরিচালক মো. কবীর হোসেন স্থানীয়দের গুজবে কান না দিয়ে প্রকল্পের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয়ে সঠিক তথ্য জানার আহ্বান জানান।
ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পে দুটি ইউনিট থেকে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এ সময়ে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে আমদানি করা ব্যয়বহুল তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে।

