ডার্ক মোড
Wednesday, 08 July 2026
ePaper   
Logo
বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বই বাণিজ্য ও ভুয়া শিক্ষার্থীসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ

বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বই বাণিজ্য ও ভুয়া শিক্ষার্থীসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ

মো. মজিবুর রহমান পাটোয়ারী, গাজীপুর

গাজীপুর: গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাহবুব বেগম ক্রমান্বয়ে নানা অনিয়ম ও ভয়াবহ আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—সরকারি পাঠ্যপুস্তক কেনাবেচা, ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা আত্মসাৎ, অর্থের বিনিময়ে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় বসার সুযোগ করে দেওয়া এবং পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র (অ্যাডমিট কার্ড) আটকে রাখা।

স্থানীয় অভিভাবক, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বার্থে পাবলিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয় প্রশাসন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত সরকারি পাঠ্যবই সংগ্রহ করতো, যা পরবর্তীতে আর্থিক লাভের জন্য অন্য কোথাও বিক্রি বা বিতরণ করা হতো।

গত ১৭ মে, ২০২৬ তারিখে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর এই অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে আসে। ওই দিন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদা বেগম নাগরী ইউনিয়নের 'গথনিকা বিদ্যানিকেতন' থেকে দুই বস্তা সরকারি পাঠ্যবই উদ্ধার করেন। এই বই উদ্ধারের ঘটনাটি স্থানীয় শিক্ষা মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং যথাযথ অনুমতি ছাড়া কীভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের বই অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বই উদ্ধারের সূত্র ধরে গথনিকা বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক দিলীপ চন্দ্র বণিক একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদানের কোনো সরকারি অনুমোদন না থাকায়, তারা দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাধ্যমে তাদের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই, নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের কাজ সম্পন্ন করে আসছেন।

এই স্বীকারোক্তি শিক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁরা বলছেন, একটি অনুমোদনহীন স্কুল এক দশক ধরে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের নিবন্ধন ও পরীক্ষা প্রক্রিয়া চালাচ্ছে—এটি স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের চরম তদারকিহীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাবকে ফুটিয়ে তোলে।

এছাড়াও, একটি অনৈতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার খবর পাওয়া গেছে, যারা বোয়ালী উচ্চ বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী সাজিয়ে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ এবং বোর্ড ফাইনালে বসার জন্য মোটা অঙ্কের ফি আদায় করতো। একই সাথে অভিযোগ উঠেছে যে, অবৈধ আর্থিক দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় বেশ কয়েকজন প্রকৃত পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্র আটকে রেখেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ, যা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্কুলের জমি ব্যবহার এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার স্পষ্ট অভাবের কথা উল্লেখ করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের ওপর একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় নাগরিক নেতৃবৃন্দ জোর দিয়ে বলেছেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত স্বার্থে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যাবে না। সরকারি পাঠ্যবই, পাবলিক রেজিস্ট্রেশন এবং বোর্ড পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অনিয়ম কেবল আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের বিশ্বাসকেও ভেঙে চুরমার করে দেয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা মাহবুব বেগমের বক্তব্য জানতে তাঁর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে, এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি রোধে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা, জবাবদিহিতা নির্ধারণ এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন