ডার্ক মোড
Thursday, 16 July 2026
ePaper   
Logo
বরাদ্দ সংকটে নাজুক ৮৯টি স্লুইসগেট, ঝুঁকিতে বাঁশখালীর উপকূল

বরাদ্দ সংকটে নাজুক ৮৯টি স্লুইসগেট, ঝুঁকিতে বাঁশখালীর উপকূল

এম আর আমিন, চট্টগ্রাম


৭০-৮০-এর দশকে নির্মিত স্লুইসগেটের অধিকাংশই বর্তমানে জরাজীর্ণ নতুন গেট নির্মাণ ও সংস্কার না হওয়ায় বাড়ছে জলাবদ্ধতা উপকূলীয় ঝুঁকি।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে স্লুইসগেটগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে মাছ ও লবণের ঘের রক্ষা করে আসছে।অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় ঘের ডুবে যাওয়ার ভয়ে তারা নিয়মবহির্ভূতভাবে গেট বন্ধ রাখে। এর ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানি স্বাভাবিকভাবে সমুদ্রে বা নদীতে নামতে পারে না।সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষার এই অসাধু প্রক্রিয়ার কারণে কৃত্রিম ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এই জলাবদ্ধতায় কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে। সব হারিয়ে সাধারণ মানুষকে চূড়ান্ত মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি পাহাড়ি ঢলে
মানুষের জীবন বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যায়। এতে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলো।

প্রাথমিকভাবে মাছ ও লবণের ঘের রক্ষায় স্লুইসগেট বন্ধ করে দেওয়াকেই দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
এছাড়া, অবৈধভাবে নির্মিত কিছু বাঁধের কারণে বন্যার পানি নিষ্কাশনে ধীরগতির কথাও বলছেন তারা।


স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, মাছ ও লবণের ঘের রক্ষার জন্য বাঁশখালীতে স্লুইসগেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। কৃত্রিম জলাবদ্ধতার কারণে বন্যায় চরম দুর্ভোগে পড়েন লাখো মানুষ।

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বাঁশখালীর মানুষের ফসলি জমি ও বসতভিটা জোয়ারের নোনা পানির আগ্রাসন থেকে রক্ষায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৪৯.৮৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জোয়ারের নোনা পানি ঠেকানো এবং ভাটার সময় বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে নিষ্কাশনের জন্য ৮৯টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়।

তবে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ৪০ থেকে ৫৬ বছর আগে নির্মিত এসব স্লুইসগেটের অধিকাংশই বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সম্পূর্ণ অচল এবং ১৭টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। অবশিষ্ট ৫৬টি স্লুইসগেটও কোনোরকমে সচল থাকলেও কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্লুইসগেটগুলো এখনও কার্যকর রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু বছরের পর বছর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এখন অনেক স্লুইসগেটই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
দ্রুত অচল স্লুইসগেটগুলো প্রতিস্থাপন, ক্ষতিগ্রস্ত গেটগুলোর সচল আধুনিকায়ন না করা হলে ভবিষ্যতে উপকূলীয় এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।


বাঁশখালী প্রায় ৪০টি ছোট-বড় পাহাড়ি ছড়া ও খাল রয়েছে । তবে সরকারি তথ্যমতে, এখানে ২৯টি প্রধান খাল ও ছড়া রয়েছে যা দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে।
এতে স্লুইসগেট কানেক্টিং খালগুলো দীর্ঘদিন খননের অভাবে পানি নিষ্কাশনের কার্যকারিতা হারাচ্ছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব অবকাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। প্রতি বছর প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ দিয়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত করা যাইতো তাহইলে স্লুইসগেটগুলো কার্যকর রাখা সম্ভব হতো।ভারী বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যেত এবং বন্যা পরিস্থিতিও এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করত না। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নদী-খালের স্লুইসগেট বন্ধ করে, খালের পাড় দখল করে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে এই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে নষ্ট করে দিয়েছে।

 

এলাবাসীর অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অথচ বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো প্রকল্পগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও বরাদ্দ মেলে মাত্র ২ /৩কোটি টাকা। প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে এ সমস্যা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব। পাশাপাশি স্লুইস গেটগুলোকে সময়োপযোগী ও কার্যকর করে তোলারও যাবে।

 

বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছিলেন। তারা মাছের ঘেরের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্লুইসগেটগুলো বন্ধ করে রাখতেন।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাবে এসব স্লুইসগেট কার্যত মাছের ঘেরে পরিণত হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা ২০টি স্থানে বাঁধ কেটে পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছি।তিনি আরও বলেন, স্লুইসগেটগুলো দিয়ে যদি যথাযথভাবে পানি নিষ্কাশন করা যেত, তাহলে বন্যা পরিস্থিতির এতটা অবনতি হতো না।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড পওর (২) নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজীর সাইফ আহমেদ বলেন,বাঁশখালীর বিদ্যমান স্লুইসগেটগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই এগুলো পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ভেন্টের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত (ব্রিচ) অংশগুলো বন্ধ করার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে ৩৩টি স্লুইসগেট প্রতিস্থাপন, জলকদর খাল ও ছোট চনুয়া খালের পুনঃখনন এবং কয়েকটি স্থানে বাঁধ পুনর্বিন্যাস (রি-সেকশনিং) কাজ অন্তর্ভুক্ত করে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহেই ডিপিপিটি জমা দেওয়া হবে।
এর আগে একটি ডিপিপি জমা দেওয়া হলেও তা অনুমোদন পায়নি। তবে প্রথম পর্যায়ে সমুদ্র উপকূলীয় অংশের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছি।

তিনি আরও জানান, ঘের বাঁচাতে স্থানীয়রা অবৈধভাবে কিছু বাঁধ তৈরি করেছেন। এ কারণে বন্যার পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকছে এবং এতে এ অঞ্চলের কয়েক লাখ বাসিন্দা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।


পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যেন জোয়ারের সময় লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সেভাবে ডিজাইন করে স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছিল।

স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, জোয়ারের সময় এই গেটগুলো বন্ধ রাখা হয় যেন সমুদ্রের পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে। আর ভাটার সময় গেটগুলো খুলে যায়, যেন উজানের বন্যার পানি ও বৃষ্টির পানি নদী হয়ে সাগরে চলে যেতে পারে।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন