পাবনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও মাদ্রাসা শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ
পাবনা প্রতিনিধি
পাবনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগের আতাইকুলা ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও শিবপুর ত্বাহা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক শামসুল আলম মঞ্জু এবং একই প্রতিষ্ঠানের প্রভাষক আফরোজা খাতুনের বিরুদ্ধে অনৈতিক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তাদের অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে এলাকা। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) মাদ্রাসার প্রধান ফটকে এ কর্মসূচি পালিত হয়| পরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও অভিভাবকেরা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং আটঘরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মঞ্জু মাস্টার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নামকাওয়াস্তে শিক্ষকতা দেখিয়ে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করতেন| অতীতেও তার বিরুদ্ধে নারীঘটিত একাধিক অপকর্মের অভিযোগ থাকলেও ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি।
সরকার পতনের পরও তিনি তার অপকর্ম বন্ধ করেননি। স্থানীয় অভিভাবকেরা জানান, সম্প্রতি একই মাদ্রাসার বিতর্কিত শিক্ষিকা আফরোজা খাতুনের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন মঞ্জু মাস্টার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সম্পর্কের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি তাদের অনৈতিক সম্পর্কের প্রমাণ পেয়ে মঞ্জু মাস্টারের স্ত্রী শারমিন আলমও বাড়ি ছেড়ে গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন এবং সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে অস্বস্তি বোধ করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, মঞ্জু মাস্টার ও আফরোজা খাতুনের অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি এলাকায় 'ওপেন সিক্রেট। শিক্ষকের মতো মহান পেশায় থেকে তারা কলঙ্কজনক কাজ করছেন।
অতীতেও তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে একাধিক অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠলেও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এতে আমরা চরম লজ্জিত ও বিব্রত|"
রাহিমুল ইসলাম সহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আফরোজা ম্যাডামকে নিয়ে বেশকিছু অভিযোগ আছে। এর আগে আরেকটি মাস্টারের সাথে খারাপ সম্পর্কের নালিশ আমাদের কাছে আসছিলো। এর আগে এই ম্যাডাম আগের স্বামীর সাথেও ঝামেলা করেছে। তার থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা নিছে। সেসবের প্রমাণের কাগজপত্রও আমাদের কাছে আছে। আবার এখন মঞ্জু মাস্টারের সাথে শুরু করছে। অথচ ক্ষমতার দাপটে তাদের মত নোংরা ব্যক্তিরা বহাল তবিয়তে মাস্টারি করছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও কিছু বলে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মঞ্জু মাস্টার প্রায় এক বছর মাদ্রাসায় উপস্থিত না হয়েও মাদ্রাসা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিয়মিত বেতন তুলেছেন। অন্যদিকে, শিক্ষিকা আফরোজা খাতুনের স্বামী মহিউল আলম ২০২০ সালে আত্মহত্যা করেন| পরবর্তীতে আফরোজা দ্বিতীয় বিয়ে করলেও তা গোপন রেখে মৃত স্বামীর সরকারি পেনশন আত্মসাৎ করে আসছিলেন। ২০২৫ সালে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তার পেনশন বন্ধ হয়।
অভিযোগে সংযুক্ত নথিসূত্রে জানা যায়, প্রেমের সম্পর্কের জেরে অশ্লীল ভিডিও প্রকাশ ও দ্বন্দ্বের ঘটনায় ২০২৬ সালে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিজের দায়ের করা একটি মামলায় আফরোজা খাতুন নিজেই অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
স্বামীর অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে শামসুল আলম মঞ্জুর মাস্টারের স্ত্রী শারমিন আলম বলেন, গত এক বছর ধরে আমার স্বামীর সঙ্গে আফরোজা ম্যাডামের সম্পর্কের জেরে সংসারে চরম মনোমালিন্য চলছে। বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা থামেননি। সম্প্রতি তাদের গোপন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ পেয়ে ঘৃণায় আমি বাসা ছেড়ে চলে এসেছি। শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় থেকে এমন কাজ ভাবতেই ঘৃণা হয়| আমি তাদের শাস্তি চাই।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে শিক্ষিকা আফরোজা খাতুনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি| গণমাধ্যমকর্মীরা মাদ্রাসায় গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কৌশলে পেছনের দরজা দিয়ে কেটে পড়েন।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অসত্য দাবি করেছেন শামসুল আলম মঞ্জু| তিনি বলেন, আমার স্ত্রী তার প্রথম পক্ষের সন্তানকে বঞ্চিত করে সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিতে চায়| তা না দেওয়ায় সে মিথ্যা অভিযোগ তুলছে| এলাকাবাসীকে ভুল বোঝানো হয়েছে। আমি কোনো অনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে কখনোই জড়িত ছিলাম না।
এবিষয়ে শিবপুর ত্বাহা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় সরেজমিনে গিয়ে অধ্যক্ষকে পাওয়া যায়নি| উপাধ্যক্ষ আব্দুল আলিম বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, এগুলো তাদের ব্যক্তিগত বিষয়| এ বিষয়ে আমাদের কিছু বলা বা করার নেই।
আটঘরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিদুল ইসলাম বলেন, আমি এখনো ডাক ফাইল খুলতে পারিনি। ফলে লিখিত অভিযোগপত্রের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নই। তবে অভিযোগ পেলে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে ও তদন্ত করে ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

