দুদকের মামলায় ডিপিএইচই’র এস্টিমেটর আনোয়ার সিকদার: নিরাপদ পানি প্রকল্প ঘিরে টেন্ডার সিন্ডিকেট, শতকোটি টাকার লেনদেন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ‘সমগ্র বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ ঘিরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, জাল নথি দাখিল এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর এস্টিমেটর (উপসহকারী প্রকৌশলী) মো. আনোয়ার হোসেন সিকদার। তার ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকল্পের প্রাক্কলন নির্ধারণ ও কারিগরি শর্ত তৈরির ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাববলয় দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা তৈরি করেছে—যার আর্থিক পরিমাণ কয়েক দশ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
দুদকের এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে স্ত্রীর মালিকানাধীন ‘মেসার্স ওহী ট্রেডার্স’ নামে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যশোর ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন কার্যালয় থেকে কয়েক দফায় ১০ কোটির বেশি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যশোর অফিস থেকে দরপত্রের কাজের বিল বাবদ ৫ কোটি ১৭ লাখ ১৭ হাজার ৪১০ টাকা, চাঁদপুর অফিস থেকে গভীর নলকূপ স্থাপনের নামে ৫ কোটি ৫১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮২ টাকা এবং ঢাকা অফিস থেকে মালামাল সরবরাহের নামে ৭৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫৯ টাকা উত্তোলনের তথ্য এজাহারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জাল বা ভুয়া ক্রেডিট কমিটমেন্ট দাখিলের অভিযোগও রয়েছে, যা প্রমাণিত হলে তা দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নিরাপদ পানি প্রকল্পে এস্টিমেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে আনোয়ার সিকদার টেন্ডারের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ, প্যাকেজ বিভাজন, কারিগরি মানদণ্ড ও যোগ্যতার শর্ত প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। এই অবস্থান থেকে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে দরপত্রের ‘রেট’ আগেভাগে ফাঁস করা, কারিগরি শর্ত এমনভাবে সাজানো যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়, এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়ার মতো অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গোপালগঞ্জ জেলায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার সোলার প্যানেল স্থাপন টেন্ডারে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে শর্ত সাজানোর অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। একই জেলায় আরেকটি টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা তিন প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৯ শতাংশ বেশি দরে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর অভিযোগও রয়েছে—যা বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়।
খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে এফআরপি ভেসেল ও অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত টেন্ডারেও প্রতিযোগিতা সীমিত করার অভিযোগ এসেছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, কারিগরি অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার মানদণ্ড এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে স্থানীয় বা সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত অংশ নিতে না পারেন। মাঠপর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে আসা নির্দেশনা অনুসরণে বাধ্য থাকতে হয়; ফলে টেন্ডার আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।
আনোয়ার সিকদারের ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সীমিত সরকারি বেতনের বিপরীতে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি, গ্রামের বাড়িতে জমি ও ভবন এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ রয়েছে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট, ধানমন্ডিতে যৌথ মালিকানায় একটি ফ্লোর, সাভার সংলগ্ন এলাকায় বহুতল ভবন, টাঙ্গাইল জেলায় জমি ও বাড়ি—এমন বিভিন্ন সম্পদের তথ্য অভিযোগপত্রে উত্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থায়ী আমানত (এফডিআর) থাকার কথাও বলা হয়েছে। এসব সম্পদের উৎস, আয়কর রিটার্নে ঘোষণার অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না—তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে।
সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা নিজে বা পরিবারের সদস্যের নামে সরাসরি ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারেন না; আবাসিক বা বাণিজ্যিক সম্পদ ক্রয়/নির্মাণের ক্ষেত্রেও অর্থের উৎস উল্লেখপূর্বক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর নামে লাইসেন্স নিয়ে প্রকল্পের কাজ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা বিধিমালা লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন। তবে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব নয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, প্রকল্পভিত্তিক কমিশন বাণিজ্যের অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ, সম্পদে রূপান্তর কিংবা বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থপাচার ও আয়কর ফাঁকির বিষয়টি প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত হলেও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশ পায়নি। সংশ্লিষ্ট আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ও কর কর্তৃপক্ষকে অনুলিপি দেওয়ার বিষয়টিও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দপ্তরে গেলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার আইনজীবী বা পরিবারের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পটি ২০২০ সালে অনুমোদিত একটি বৃহৎ উন্নয়ন কর্মসূচি, যার লক্ষ্য ছিল আর্সেনিক ও দূষণমুক্ত পানি সরবরাহের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। প্রকল্পের আর্থিক পরিমাণ ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিবেচনায় টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এমন মত বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে উন্নয়ন প্রকল্পে সুশাসনের বার্তা যাবে।
দুদক জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার কারিগরি দিকসমূহ পরীক্ষা করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে; আর প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তরা আইনি প্রতিকার পাবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের। সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

