ডার্ক মোড
Wednesday, 08 July 2026
ePaper   
Logo
টেন্ডার না পেয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তে মিলছে ভিন্ন চিত্র

টেন্ডার না পেয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তে মিলছে ভিন্ন চিত্র

অলিউল্লাহ্ ইমরান, বরগুনা
 
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বরগুনা কার্যালয় থেকে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে “বরগুনা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্প”-এর আওতায় ১৪টি সড়ক নির্মাণ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) পদ্ধতিতে আহ্বান করা এ টেন্ডারে বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। যাচাই-বাছাই শেষে সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০২৫ ও ই-জিপি পদ্ধতি অনুসরণ করে সর্বনিম্ন দরদাতাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
 
এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এ প্রকল্পের আওতায় বরগুনার বিভিন্ন উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইনভিত্তিক ই-জিপি সিস্টেমে দরপত্র জমা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
 
তবে টেন্ডার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই আমতলী ও তালতলী অংশের প্রায় ২৭ কোটি টাকা মূল্যের চারটি দরপত্র নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন তালতলীর বাসিন্দা ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন। তিনি প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) এবং বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন।
যেসব টেন্ডার নিয়ে অভিযোগ ওঠে, সেগুলোর মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের জন্য বরগুনা জেলা কার্যালয় থেকে এলজিইডির কেন্দ্রীয় প্রকিউরমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে পুনরায় যাচাই-বাছাই শেষে দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির কোনো অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় দপ্তর।
 
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, আমতলী ও তালতলী উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের চারটি কাজে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, নিম্নমানের কাজ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগও তোলা হয়।
 
ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন অভিযোগ করেন, এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান, জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন এবং সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহ তাঁদের নিকটাত্মীয়দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এম এ লুৎফুল কবির ট্রেডার্স, এমএস নুর কনস্ট্রাকশন, লেলিন-দীপ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ও নিশিত বসু ট্রেডার্সের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগও আছে।
 
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযোগকারী ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন নিজেও এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন “শাহরিস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড”-কে কাজ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ প্রতিবেদকের হাতে আসা কয়েকটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, টেন্ডার শুরুর আগেই তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিজের মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কাউকে কাজ না দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ই-জিপি সিস্টেম ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ পায়নি। এরপর থেকেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিতে শুরু করেন বলে দাবি এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তার। 
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন বলেন, ১৭ বছর আমাদের দলীয় নেতাকর্মীরা মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মামলা পরিচালনা ও উপকৃত করার জন্য আমি নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে কাজগুলো চেয়েছি।
 
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এ লুৎফুল কবির ট্রেডার্সের প্রতিনিধি মো. সিরাজ বলেন, আমরা নিয়ম মেনেই টেন্ডারে অংশ নিয়েছি। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হওয়ায় কাজ পেয়েছি। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাবের সুযোগ নেই।
 
একই টেন্ডার কার্যক্রমে অংশ নেওয়া আল-মামুন এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মো. রাজন বলেন, আমরাও এই টেন্ডারে অংশ নিয়েছিলাম। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় কাজ পাইনি। এখন ই-জিপিতে সম্পন্ন হওয়া টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হাস্যকর। এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই।
 
এলজিইডি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো কাজের বাস্তবায়ন পুরোপুরি শুরু হয়নি। ফলে “নিম্নমানের কাজ সম্পাদন” সংক্রান্ত অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘনেরও কোনো নথিপত্র অভিযোগে সংযুক্ত করা হয়নি।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এলজিইডির বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহা. নুরুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্তে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ না মিললেও, অভিযোগকে কেন্দ্র করে বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
 
এলজিইডির দাবি, পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া ই-জিপি ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা-২০২৫ অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা এখনো পাওয়া যায়নি।
 
জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।
 
এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান বলেন, সরকারি ক্রয় বিধিমালা ও ই-জিপি নীতিমালা অনুসরণ করেই দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে।
 
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বরগুনা জেলা শাখার সদস্য সচিব হুমায়ুন হাসান শাহীন বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে তার দায় দল নেবে না। কোনো ব্যক্তি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে কাজ না পেয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
 
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে কেউ অভিযুক্ত না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের স্বপদে বহাল রাখা হবে।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন