যুক্তরাষ্ট্রে জালিয়াতির সাম্রাজ্য রংপুরের এক পরিবারের, ক্ষুণ্ন হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে মানবপাচার ও অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রংপুরের এক প্রবাসী পরিবারের বিরুদ্ধে। ভুয়া ভাই-বোন সেজে এবং একাধিক ভুয়া বিয়ের নাটক সাজিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই চক্রের কারণে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ২৩ নং ওয়ার্ডের ইসলামপুর হনুমান তলা (বাসা নং- ৭৬/৩) এলাকার বাসিন্দা মোঃ আমিন উদ্দিন ও মোছাঃ বেগমের কন্যা উম্মা সালমা (জন্ম তারিখ: ২৮/১০/১৯৮২, এসএসএন নং- ৭২৯০৯০৭৭৪) নব্বইয়ের দশকে ডিভি লটারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তিনি মেতে ওঠেন জালিয়াতির ব্যবসায়। কয়েক বছর আগে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মোঃ আসিফ মাহমুদ (জন্ম তারিখ: ১৯/০৯/১৯৯৯) নামের এক যুবককে নিজের আপন ছোট ভাই সাজিয়ে এবং নিজের বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। বর্তমানে উম্মা সালমা এবং তার এই কথিত ভাই আসিফ মাহমুদ নিউইয়র্কের জেএফকে (JFK) বিমানবন্দরে সিবিপি (কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন) বিভাগে কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আসিফ মাহমুদ মূলত উম্মা সালমার জৈবিক ভাই নন। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট ফাঁকি দিয়ে জালিয়াতিপূর্ণ অভিবাসনের (Fraudulent Immigration) মাধ্যমে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর এই আসিফ মাহমুদ তার কথিত বৃদ্ধ বাবা-মাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেন। অথচ বর্তমানে ওই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করে এবং নিজেকে 'কেয়ারগিভার' (সেবাদানকারী) দেখিয়ে মার্কিন সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ ডলার ভাতা হিসেবে তুলে নিচ্ছেন এই প্রতারক।
উম্মা সালমার বিরুদ্ধে ভুয়া বিয়ের মাধ্যমেও মার্কিন নাগরিকত্ব বিক্রির ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার পর তিনি প্রথমে মোঃ তারেক আরাফাত নামের এক বাংলাদেশিকে বিয়ে করে নাগরিকত্ব পেতে সহায়তা করেন। তারেক আরাফাত নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তাকে ডিভোর্স দিয়ে মাত্র ৪ মাসের মাথায় আল-বাহারুল কাদের (জন্ম তারিখ: ১০/০৩/১৯৯৩) নামের নিজের চেয়ে ১২ বছরের ছোট এক যুবককে বিয়ে করেন এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে তাকেও যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এভাবে একের পর এক ভুয়া অভিবাসন ব্যবসার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানামুখী হয়রানি ও সন্দেহের মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগেও উম্মা সালমা তার এলাকার এক হিন্দু যুবকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেননি। এই নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিশ-বিচার হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। বর্তমানে এই চক্রটি নিউইয়র্কের রনকনকোন এলাকার ৪০, ফোর্থ স্ট্রিট (NY-11779) নামক ঠিকানায় বসবাস করছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি এখন উম্মে কুলসুম ও আপেল মাহমুদ নামের আরও দুজনকে একইভাবে অবৈধ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এর মধ্যে আপেল মাহমুদ পেশায় একজন ডেন্টাল সার্জন এবং তিনিই আসিফ মাহমুদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন বলে জানা গেছে।
এসব জালিয়াতি ও প্রতারণার বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত উম্মা সালমা ও মোঃ আসিফ মাহমুদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এই চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা।

