ডার্ক মোড
Friday, 25 September 2026
ePaper   
Logo
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: শান্তিময় বিশ্ব নির্মাণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের রূপরেখা

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: শান্তিময় বিশ্ব নির্মাণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের রূপরেখা

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, জলবায়ু ন্যায়বিচার, অভিবাসী অধিকার এবং রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে তিনি একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজ এবং স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন।

ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিকে অভিনন্দন জানান এবং বিদায়ী সভাপতি এনালেনা বেয়ারবক-কে তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

একইসঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদ ও আহতদের অবদানকে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করেন।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।"

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পিতা, স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তাঁর মাতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার জাতিসংঘে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণগুলোর কথা স্মরণ করে আবেগপ্লুত হন। তিনি বলেন, তাঁদের পথ অনুসরণ করেই আজ তিনি দেশের স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শান্তির বার্তা নিয়ে এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।

বিশ্বজুড়ে মানবসৃষ্ট সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ও অশান্তির কারণে জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, "যে কোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিশ্বশান্তির স্বার্থে উন্নয়ন বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।"

একইসঙ্গে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানে নিহিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে তিনি অদূর ভবিষ্যতে একটি মানবিক বিপর্যয় এড়াতে অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা অব্যাহত রাখার জোর দাবি জানান।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা থাকলেও বাংলাদেশ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি 'ক্লাইমেট জাস্টিস' ও অভিযোজন সহায়তার জন্য আসন্ন COP-31 এ জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আশা প্রকাশ করেন। দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে সরকার 'Recovery, Restoration, and Reconstruction' (3-R) কৌশল অনুসরণ করছে। তরুণদের জন্য 'স্টার্ট-আপ' ফান্ডে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ এবং দেশকে 'ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।

দেশের নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে 'ফ্যামিলি কার্ড' ইস্যু করা হচ্ছে, যা নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক। এছাড়া কৃষকদের জন্য ফার্মার্স কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং স্পোর্টস কার্ড চালু করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক, স্কুলব্যাগ ও দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রমে 'স্পোর্টস' অন্তর্ভুক্ত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এআই ও প্রযুক্তি হস্তান্তর:
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল বিভাজন যেন 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বিভাজনে' রূপ না নেয়, সে বিষয়ে বিশ্বনেতাদের সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিতে জাতিসংঘের সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।

বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, "রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করবে এবং জনগণ পাবে নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা।" 'সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ' প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বিশ্বশান্তি ও সমৃদ্ধি রক্ষায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ আস্থা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি ভাষণ শেষ করেন।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন