জঙ্গল সলিমপুরে উন্নয়নের নতুন অধ্যায়: সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু
মো. নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ও ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। অপরাধপ্রবণ এই অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে চারটি কৌশলগত সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনে থাকা ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (২৬ ইসিবি) আজ সোমবার এই অবকাঠামো প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করে। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরের পূর্ব দিকের পাহাড়ি এলাকায় চলমান নির্মাণকাজ সরজমিনে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ২৬ ইসিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ, পিএসসি।
অধিনায়ক জানান, এই অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনায় ছিন্নমূল বস্তি এলাকা থেকে সরাসরি আলীনগর হাই স্কুল পর্যন্ত একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। এছাড়া একটি প্রধান সড়ক আলীনগর থেকে টেক্সটাইল এলাকা হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে যুক্ত হবে এবং আরেকটি বাইপাস সড়ক বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) পাশ দিয়ে আলীনগরকে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত করবে। এই পরিকল্পনায় জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরের যোগাযোগ সহজ করতে চতুর্থ আরেকটি অভ্যন্তরীণ বাইপাস সড়কও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল আল মাসুদ উল্লেখ করেন, এই প্রকল্পের জন্য এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত না হলেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি আস্থা ব্যক্ত করেন যে, জটিল ও পাহাড়ি অঞ্চলে প্রকৌশলগত কাজ সম্পাদনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলার অধীনস্থ জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম দুর্গম এবং ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। কয়েক দশক ধরে এই পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত ছিটমহলটি অবৈধ ভূমি দখল, জমির অবৈধ ব্যবসা এবং সংগঠিত সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এই সংকটের সূত্রপাত ১৯৯০-এর দশকে, যখন আলী আক্কাস নামের এক ব্যক্তি সরকারি খাস জমি দখল করে সেখানে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে একটি কাল্পনিক "ছিন্নমূল পুনর্বাসন" প্রকল্পের আড়ালে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে প্লট বিক্রি করে সেখানে অবৈধ প্লট ব্যবসার প্রসার ঘটে।
সম্প্রতি গত ১৯ জানুয়ারি এলাকাটি দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে, যখন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) একটি বিশেষ অভিযানে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে র্যাবের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া মর্মান্তিক ভাবে নিহত হন। এর জবাবে গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং এপিবিএন-এর প্রায় ৪,০০০ সদস্যের একটি যৌথ টাস্কফোর্স জঙ্গল সলিমপুরে এক বিশাল চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেখানে একটি স্থায়ী যৌথ নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন করে।
এতসব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও এলাকাটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৪ মে গভীর রাতে সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীরা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে এক দুঃসাহসিক হামলা চালায়, যা পরবর্তীতে পুলিশ ও র্যাবের পাল্টা গুলিবর্ষণের মুখে নস্যাৎ হয়। ওই বন্দুকযুদ্ধের আগে অপরাধীরা বুলডোজার দিয়ে একটি নির্মাণাধীন নিরাপত্তা চৌকি গুঁড়িয়ে দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশ পথ বন্ধ করতে আস্ত একটি রাস্তা খুঁড়ে ফেলে।
স্থানীয় প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই সড়ক নেটওয়ার্কের সফল সমাপ্তি ঘটলে তা ওই এলাকায় প্রশাসনিক প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করবে, স্থায়ীভাবে অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেবে এবং সাধারণ বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যাতায়াতের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব করবে।

