ডার্ক মোড
Sunday, 13 September 2026
ePaper   
Logo
মন্তব্য প্রতিবেদন :  গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মওকুফ নিয়ে হাইকোর্টের রায় প্রমাণ করে ড. ইউনুস ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন

মন্তব্য প্রতিবেদন : গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মওকুফ নিয়ে হাইকোর্টের রায় প্রমাণ করে ড. ইউনুস ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন

হেমায়েত হোসেন


সম্প্রতি হাইকোর্ট বিভাগ নোবেলজয়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রামীণ কল্যাণ’-কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।

২০১৭ সাল থেকে বিচারাধীন এই মামলার রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছেন যে আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালে কি ড. ইউনূস তার পদের প্রভাব খাটিয়ে এই মামলার ওপর প্রভাব ফেলার চেষ্টা করেছিলেন, নাকি এটি শুধুই নীতিগত ও আইনি ব্যাখ্যার মতপার্থক্য ছিল?

সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে যে, ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শীর্ষ দায়িত্বে থাকাকালে তার প্রতিষ্ঠানের কর মওকুফ এবং মামলা প্রত্যাহারের যে খবর ছড়ায়, তা ছিল স্পষ্ট ক্ষমতার অপব্যবহার। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পদটি ব্যবহার করে নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার একটি মানসিকতা এখানে প্রকাশ পেয়েছিল। তৎকালীন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এই সংবাদকে ঘিরে সুশাসন এবং ক্ষমতার নৈতিক সীমানা নিয়ে জোর সমালোচনা তৈরি হয়।

গত জুলাইয়ে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, কর মওকুফ বা মামলা প্রত্যাহারের খবরগুলো ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর ছিল। গ্রামীণ কল্যাণের মূল আইনি যুক্তিটি ছিল কর ফাঁকি নয়, বরং 'দ্বৈত কর' সংক্রান্ত। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণফোন থেকে লভ্যাংশ পাওয়ার সময়ই উৎসে ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখা হয়েছিল। তাই পুনরায় অতিরিক্ত কর আরোপের আইনি ভিত্তি চ্যালেঞ্জ করেই তারা ২০১৭ সালে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন।

যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত, তা হলো ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর মামলাটির গতিপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ২০২৪ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রিট খারিজ করে রায় দেওয়ার পর কনিষ্ঠ বিচারপতির আগের এক দায়িত্বে ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) দেখা দেওয়ায় রায় প্রত্যাহার করা হয় এবং আইন অনুযায়ী মামলাটি নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়।

যদি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনি বিচারবিভাগে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন, তবে হাইকোর্টের নতুন বেঞ্চ থেকে এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব দাবি বহাল রেখে এই রায় আসত না। হাইকোর্টের এই রায়ই প্রমাণ করে যে দেশের বিচারব্যবস্থা তার নিজস্ব আইনি যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আদালতের চূড়ান্ত রায়ে এনবিআরের পাওনা ৬৬৬ কোটি টাকার দাবি বহাল থাকায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, কর মওকুফের বিষয়ে গ্রামীণ কল্যাণের প্রাথমিক অবস্থানটি আইনগতভাবে টেকসই ছিল না। আইনের শাসন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় এনবিআরের দাবিটিই বিজয়ী হয়েছে।
তবে এটাকে ঢালাওভাবে 'ক্ষমতার অপব্যবহার' বা 'বিচার বিভাগকে সরাসরি প্রভাবিত করা' হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তথ্যের গভীরতা মেপে দেখা প্রয়োজন।

সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে থেকে একটি সংবেদনশীল আইনি প্রক্রিয়া চলাকালে তা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, এবং প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিষয়টির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা নিশ্চিত করা তার নৈতিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু হাইকোর্টের এই স্বাধীন রায় স্বয়ং এটিই প্রমাণ করে যে বিচার বিভাগ কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা রাজনৈতিক প্রভাবে নতি স্বীকার করেনি।

গ্রামীণ কল্যাণ ইতোমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা ভাবছে। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলছে, এবং চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ের পর নিস্পত্তি হওয়া এই মামলাটি ভবিষ্যতে শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইনি বিতর্কের ক্ষেত্রে এক বড় নজির হয়ে থাকবে।

সাধারণ জনগণ এবং সুশীল সমাজ মনে করে ড. ইউনুস তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে এই বিরাট অংকের সরকারি ট্যাক্সের টাকা মওকুফ করেছিলেন এবং এটা ছিল বড় ধরনের 'স্বার্থের সংঘাত '। বিষয়টি নিয়ে তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন