বেগমগঞ্জে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কৃষক হয়রানি ও ঘুষের ব্যাপক অভিযোগ
বি. চৌধুরী তুহিন, নোয়াখালী
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) সুবর্ণ ভঞ্জের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন, চরম স্বেচ্ছাচারিতা, অসদাচরণ, কৃষক হয়রানি ও ঘুষ গ্রহণের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। চলমান অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহ মৌসুমে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, শুধুমাত্র ধান বিক্রি করতে গিয়ে তারা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং চরম হয়রানি ও দীর্ঘমেয়াদি বিলম্বের শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে খাদ্য গুদাম পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উত্থাপিত বেশ কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। কৃষকেরা আরও জানিয়েছেন, অফিস চলাকালীন ওই কর্মকর্তা প্রায়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। চন্দ্রগঞ্জের এক কৃষক জানান, এক সপ্তাহ আগে ধান সরবরাহ করলেও তিনি এখনও বিল পাননি। গত সাত দিন ধরে তাঁকে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘোরানো হচ্ছে, অথচ ওসি তাঁর কোনো অভিযোগ শুনতেই রাজি নন।
দক্ষিণ-পূর্ব একলাশপুরের আরেক কৃষক সাইফুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী জানান, তিনি ওই কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে নির্ধারিত তারিখে তাঁর ফসল নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু সেখানে তাঁকে ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক ধীরগতির মুখোমুখি হতে হয়। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে ট্রাক আটকে থাকায় তাঁর ধানের আর্দ্রতার (ময়েশ্চার) পরিমাণ বেড়ে যায়। সাইফুদ্দীন যখন গুদামে থাকা সরকারি ফ্যান দিয়ে ধান শুকানোর চেষ্টা করেন, তখন ওসি তাঁর সাথে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। সাইফুদ্দীন পরে জানতে পারেন যে, ওসির সাথে আগে থেকে আর্থিক লেনদেন বা ঘুষের চুক্তি না করলে গুদামে সহজে প্রবেশ করা কার্যত অসম্ভব।
এই ভোগান্তি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না অসুস্থ ও প্রবীণ ব্যক্তিরাও। নাজিরপুর কেরানী বাড়ির হক সাহেব নামে এক অসুস্থ কৃষককে সকাল ১১টায় গুদামের তালাবদ্ধ প্রধান গেটের বাইরে কাঁদতে দেখা যায়, যিনি কেবল ধান বিক্রির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন। শরীফ নামের আরেক কৃষক অভিযোগ করেন, অফিশিয়াল সিরিয়াল নম্বর পাওয়ার পরও ধান বোঝাই ট্রাক খালাস করার কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে কয়েকদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়। তাঁর মতে, প্রতি টনে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষের চুক্তিতে কৃষকেরা রাজি না হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি আটকে রাখা হয়, যা শেষ পর্যন্ত নিরুপায় কৃষকদের এনাম নামের এক অফিস পিয়নের মাধ্যমে ওসির সাথে রফাদফা করতে বাধ্য করে। ক্ষুব্ধ কৃষকেরা এই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে একটি প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত ওসি এলএসডি সুবর্ণ ভঞ্জ অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে বেগমগঞ্জ উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা (টিসিএফ) মো. কামরুল হাসান স্বীকার করেছেন যে, অভিযোগের ধরন এবং ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে এ ধরনের অসদাচরণ ঘটে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) মো. আসিফ পারভেজ জানান, সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অধিদপ্তরে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ পাঠানো হবে।
উল্লেখ্য, চলতি বছর সরকার নোয়াখালী জেলায় অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১১,২২০ মেট্রিক টন, যার মধ্যে বেগমগঞ্জ উপজেলা খাদ্য গুদামের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ১,৭৯৯ মেট্রিক টন।

