ডার্ক মোড
Tuesday, 23 June 2026
ePaper   
Logo
খামারবাড়ির ডিএই কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ

খামারবাড়ির ডিএই কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ

এ বি রাজ্জাক

রাজধানীর খামারবাড়িতে অবস্থিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত উপপরিচালক এ এ মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, কোটি কোটি টাকার বদলি ও টেন্ডার সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং পলাতক আসামিদের আশ্রয় দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই কর্মকর্তার লাগামহীন অপতৎপরতা ও তাঁর সিন্ডিকেটের কাছে অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মাসুম বিল্লাহ খামারবাড়িতে এক প্রকার 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' কায়েম করেছেন এবং নিজেকে স্বঘোষিত "দ্বিতীয় ডিজি" হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। ডিএই-এর মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আবদুর রহিমের সাথে একই জেলায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি অধিদপ্তরে এমন বিপুল প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

পলাতক আসামিদের সুরক্ষা ও দুর্নীতি মামলা

দাপ্তরিক সূত্র জানায়, এর আগে খামারবাড়িতে ভুয়া বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপসহকারী পরিচালক এস এম আনিসুজ্জামান একটি মামলা দায়ের করেছিলেন (মামলা নং: সিআর-৯০/২০২২)। এই মামলার চার্জশিটভুক্ত অন্যতম আসামি সাবেক সহকারী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ শরিফুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে থাকলেও, মাসুম বিল্লাহর সরাসরি আশ্রয়ে অন্য মূল পলাতক আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন মামলার দ্বিতীয় আসামি এবং নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারে কর্মরত উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক অলিউল্লাহ প্রধান এবং ভুয়া ভাউচারের মূল হোতা হিসেবে সন্দেহভাজন প্রশাসন ও অর্থ শাখার সাবেক ক্যাশিয়ার মো. জাহিদ হাসান।

বদলি বাণিজ্য ও লাখ লাখ টাকা ঘুষের চুক্তি

এই সিন্ডিকেটের প্রভাবের বিষয়টি সম্প্রতি একটি বদলি আদেশের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। গত ১৯ মে, ২০২৬ তারিখে ক্যাশিয়ার মো. জাহিদ হাসানকে ময়মনসিংহ এবং ক্যাশ সরকার মো. হাবিবুর রহমানকে চাঁদপুরে বদলি করা হয় এবং ২১ মে, ২০২৬ তারিখে তাদের তাৎক্ষণিক অবমুক্তির (রিলিজ) আদেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু নতুন ক্যাশিয়ার মো. আল-আামিন পদে যোগদান করা সত্ত্বেও জাহিদ হাসান তাঁর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো তিনি আল-আমিনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পূর্বের পদেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বদলি বাতিলের মৌখিক আশ্বাসের বিনিময়ে জাহিদ হাসান ৫ লাখ টাকা এবং হাবিবুর রহমান ১ লাখ টাকা মাসুম বিল্লাহকে ঘুষ হিসেবে দিয়েছেন। মূলত আগামী জুন মাসের শেষ সময়ে কোটি কোটি টাকার বিল, টেন্ডার এবং কোটেশনের ভাগ পেতেই এই ঘুষের রফাদফা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর বিল্লাহ সিন্ডিকেট বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে খামারবাড়ির গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসিত করেছে। এই কর্মকর্তারা বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ঢাকার বাইরে বদলি হয়েছিলেন। বর্তমানে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পছন্দসই পোস্টিং দেওয়ার নামে জনপ্রতি ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। গত এক মাসে এই বদলি আদেশগুলো ডিএই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে অত্যন্ত গোপনে হার্ডকপি আকারে প্রার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

এমনই এক ঘটনায়, শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও উপসহকারী উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন ভূঁইয়াকে ঢাকা অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মোস্তফা খানের মাধ্যমে গত ১৪ মে, ২০২৬ তারিখের একটি ব্যাকডেটেড (পূর্ববর্তী তারিখের) চিঠির মাধ্যমে ৫ জুন, ২০২৬ তারিখে নরসিংদী হর্টিকালচার সেন্টারে বদলি করা হয়।

চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন ও সরকারি গাড়ির অপব্যবহার

মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে সিনিয়র কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে এককভাবে বদলির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভাঙারও অভিযোগ রয়েছে। বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে তিনি অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. হাসানুজ্জামানকে বদলি করান। এরপর গত ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. মুরাদুল হাসান হজে যাওয়ার পর বিল্লাহর অপতৎপরতা পুরোপুরি লাগামহীন হয়ে পড়ে। ৯ম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পছন্দসই জায়গায় বদলি করার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

তিনি একজন ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৬১৬৭) ব্যবহার করছেন। দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেও তিনি প্রতি মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ লিটার সরকারি জ্বালানি অপচয় করছেন। যেসব চালক এই অপব্যবহারে অস্বীকৃতি জানান বা প্রতিবাদ করেন, তাদের খামারবাড়ির বাইরে তাৎক্ষণিক বদলি বা চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়।

অতীতের অনিয়ম ও "অদৃশ্য শক্তি"র সুরক্ষা

খামারবাড়িতে যোগদানের আগে, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ থেকে ৫ জুন, ২০২৪ পর্যন্ত পাবনা সদর ও চাটমোহর উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালে মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম এবং কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। স্থানীয় কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাট করে তিনি একটি পাঁচতলা বিলাসবহুল ভবনসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আচরণবিধি লঙ্ঘন, খামারবাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি এবং প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ওপর শারীরিক হামলার অভিযোগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তাঁকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা শুরুর সিদ্ধান্ত হলেও, এক 'অদৃশ্য শক্তি'র প্রভাবে তিনি এখনও নিজ পদে বহাল তবিয়তে বহাল আছেন।

এই সিন্ডিকেট ভেঙে খামারবাড়িতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন