বরিশালে প্রিপেইড মিটারের সার্ভার বিপর্যয়, চরম ভোগান্তিতে গ্রাহকেরা
মো. সাইফুল ইসলাম, বরিশাল
সিস্টেম লস কমানো এবং বিলিং ব্যবস্থা সহজ করার লক্ষ্যে চালু করা প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার এখন বরিশাল নগরীর গ্রাহকদের জন্য চরম ভোগান্তি ও হয়রানির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সার্ভার ত্রুটি এবং নানা কারিগরি সমস্যার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার পর্যন্ত টানা ৩৬ ঘণ্টার তীব্র সার্ভার বিপর্যয়ে নগরীর অসংখ্য পরিবার বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটিয়েছে, যা গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। চরম ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা এখন প্রিপেইড ব্যবস্থা বাতিল করে আগের মতো প্রথাগত পোস্টপেইড মিটার পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন।
নগরীর মাটু রানাত পাবলিক লেনের বাসিন্দা জাকির জানান, মিটারের ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সার্ভার ডাউন বা অচল থাকায় তিনি কোনোভাবেই মিটার রিচার্জ করতে পারেননি। নতুন বাজারের আরেক গ্রাহক শামীম জানান, বারবার চেষ্টা করেও মিটারে টাকা রিচার্জ করতে না পারায় তাঁর অসুস্থ বাবা-মা ও ছোট সন্তানদের নিয়ে টানা দুই দিন অন্ধকারে কাটাতে হয়েছে।
গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, প্রিপেইড মিটারে টাকা কাটার ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা নেই, যা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ‘ভূতুড়ে বিলিং’। তাঁদের দাবি, রিচার্জ করা টাকার একটি বড় অংশ ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট এবং স্থায়ী মিটার ভাড়ার নামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়। অথচ এই মিটারগুলো গ্রাহকেরা নিজেদের টাকা দিয়েই কিনেছেন। এ ছাড়া ‘ইমার্জেন্সি ক্রেডিট’ বা জরুরি ব্যালেন্স সুবিধারও তীব্র সমালোচনা করেছেন গ্রাহকেরা। সংকটের সময় জরুরি ব্যালেন্স নিলে পরবর্তী রিচার্জের সময় সেই টাকা এবং জমা হওয়া মাসিক ফিসহ পুরো টাকা একসাথে কেটে নেওয়া হয়। এর ফলে নতুন করে রিচার্জ করার পরও মিটারে কোনো টাকা থাকে না, যা সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ করছে।
এই ডিজিটাল অবকাঠামোর মধ্যেও রয়েছে নানা গলদ। গ্রাহকেরা জানান, বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ওয়ালেট থেকে টাকা সফলভাবে কেটে নেওয়া হলেও ভেন্ডিং সার্ভারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তা মিটারের সাথে সিঙ্ক বা যুক্ত হয় না এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হয় না। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে খুচরা রিচার্জ পয়েন্টগুলো বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি রিচার্জের পর ২০ থেকে শুরু করে ১০০ সংখ্যারও বেশি দীর্ঘ টোকেন কোড দেওয়া হয়। দেওয়ালে ঝোলানো মিটারে ম্যানুয়ালি এই দীর্ঘ সংখ্যা প্রবেশ করানো অত্যন্ত কঠিন কাজ, বিশেষ করে বয়স্ক এবং কম শিক্ষিত মানুষের জন্য এটি একটি বড় ভোগান্তি। একটিমাত্র সংখ্যা ভুল হলে পুরো প্রক্রিয়াটি বাতিল হয়ে যায় এবং আবার নতুন করে শুরু করতে হয়।
প্রথাগত অ্যানালগ বা পোস্টপেইড সিস্টেমে বিল পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বা রেয়াতকাল পাওয়া গেলেও, প্রিপেইড মিটারে ব্যালেন্স শূন্য হওয়ার সাথে সাথেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিটারের সতর্কীকরণ অ্যালার্মের আওয়াজ এতই ক্ষীণ যে ঘরের ভেতর থেকে তা সাধারণত শোনা যায় না। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কিংবা রোগীদের মেডিকেল অক্সিজেন সাপোর্টের মতো অত্যন্ত জরুরি ও সংবেদনশীল মুহূর্তে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে গিয়ে চরম বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। মিটার নষ্ট হলে বা এলসিডি স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে গেলে বিদ্যুৎ অফিসের লাইনম্যানদের ধীরগতির কারণে গ্রাহকদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই জবাবদিহিতাহীন পরিস্থিতির কারণে বরিশালের বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ যেন হয় এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ করুক, অন্যথায় অবিলম্বে আগের পোস্টপেইড মিটার ফিরিয়ে আনুক।

