ডার্ক মোড
Monday, 31 August 2026
ePaper   
Logo
বিদ্যুৎ গেলেই পানি বন্ধ, তীব্র সংকটে পটুয়াখালী পৌরবাসী

বিদ্যুৎ গেলেই পানি বন্ধ, তীব্র সংকটে পটুয়াখালী পৌরবাসী

মনজুর মোর্শেদ তুহিন (পটুয়াখালী প্রতিনিধি)

বিদ্যুৎ চলে গেলেই থেমে যায় পানির পাম্প, আর পাম্প থামলেই বন্ধ হয়ে যায় পুরো পৌর শহরের পানি সরবরাহ। দিনে-রাতে ৮ থেকে ১০ দফা লোডশেডিংয়ে অন্তত ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পটুয়াখালী পৌরবাসী। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, টয়লেট ও স্যানিটেশন থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল-ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে জানা গেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের আদমশুমারে পটুয়াখালী পৌরসভা এলাকায় জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮২ হাজার ৫২১ জন এবং হোল্ডিং সংখ্যা ১৩ হাজার ৫০২টি। তবে বর্তমানে পৌর এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাড়ছে পানির ব্যবহার ও চাহিদা। পটুয়াখালী পৌরসভা ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা হলেও জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপের তুলনায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল।

পৌর শহরে পানি সরবরাহের জন্য বর্তমানে রয়েছে ৪টি ওভারহেড পানির ট্যাংক, ১৪টি গভীর নলকূপ ও ১২টি পাম্প জাউজ। কিন্তু পাম্প স্টেশনগুলো সম্পূর্ণ বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে পানি উত্তোলন ও সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এসব পাম্প স্টেশনে বিদ্যুতের কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ফলে পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওজোপাডিকোর ওপর নির্ভরশীল।

পৌরসভার সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মাসে সুপেয় পানির মোট চাহিদা প্রায় ৬ লাখ ঘনমিটার। বিপরীতে স্বাভাবিক সরবরাহ রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ১৩ হাজার ১০১ ঘনমিটার। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট না থাকলেও চাহিদার তুলনায় পানি সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় বাস্তবে সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

পৌর শহরের প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা পৌরসভার পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। বাকিরা নিজস্ব অর্থায়নে পানির পাম্প বসিয়ে প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। বাসাবাড়িতে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি সকল কাজ এ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের পানির মিটার সংযোগ রয়েছে ৯ হাজার ৪৮২টি। এর বাইরে মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন সেবামূলক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিনামূল্যে আরও ১৩৫টি সংযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্তত ৭০ হাজার ঘনমিটার পানি খরচ হয়।

পানির সংকটের পাশাপাশি পানি শাখার আয়-ব্যয়ের হিসাবও আলোচনায় এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পানি শাখা থেকে আয় হয়েছে ৫ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। কোটি কোটি টাকা আয়-ব্যয়ের পরও নাগরিকদের পানির সংকট কাটছে না—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী।

পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইউনুস বলেন, “আগে যেভাবে পানি পেতাম, লোডশেডিংয়ের কারণে এখন সেভাবে পাচ্ছি না। বর্তমানে পানির সংকট সাধারণ নাগরিকের জন্য একটি দুর্ভোগ। পৌরসভার নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন পানির ব্যবস্থা করা হয়, সেটাই আমরা চাই।”

পটুয়াখালী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “যদি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যেত, তাহলে পৌরবাসীর প্রয়োজনের তুলনায় ৬০ ভাগ পানি সরবরাহ করা যেত।” তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে পটুয়াখালী পৌরসভায় কোনো পাইপ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়নি। এর তুলনায় ঘনবসতি বেড়েছে ৪০ শতাংশ। পানির উৎপাদন ২০ শতাংশ বাড়ানোর জন্য সম্প্রতি পৌরসভার ভেতরে আরও দুটি গভীর নলকূপ বসানো হলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে তা সফল হয়নি।

নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, আপাতত নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় পানির পাম্প চালানোর পরিকল্পনা নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে আরও ৬টি উৎপাদক নলকূপ ও ৪টি ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বাস্তবায়ন হলে পরবর্তী ২০ থেকে ৩০ বছরের জন্য গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত বর্তমান সংকটের সমাধান কী? আগামী দুই বছরেও সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না—এমন আশঙ্কার মধ্যে শুধু ওজোপাডিকোর বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালানো কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

নগরবাসীর দাবি, দীর্ঘমেয়াদি নলকূপ ও ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে পাম্প স্টেশনগুলোতে নিজস্ব বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। জেনারেটর, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা নির্ভরযোগ্য অন্য কোনো ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকলে লোডশেডিংয়ের সময় অন্তত পানি সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দ্রুত পাইপ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পানি উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত এবং পানি শাখার আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নগরবাসীর ভাষায়, বিদ্যুৎ না থাকলে পানি থাকবে না—এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই টেকসই নগর পানি ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। ভবিষ্যতের ২০-৩০ বছরের পরিকল্পনার পাশাপাশি আজকের পানির সংকটের সমাধান আজই করতে হবে—এটাই এখন পটুয়াখালী পৌরবাসীর প্রধান দাবি

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন