ডার্ক মোড
Wednesday, 30 September 2026
ePaper   
Logo
‘চকচকে চালের কাছে হেরে যাচ্ছে লালচে চাল’  প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধানের জেলা দিনাজপুরে ৬ বছরে বন্ধ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার হাসকিং মিল

‘চকচকে চালের কাছে হেরে যাচ্ছে লালচে চাল’ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধানের জেলা দিনাজপুরে ৬ বছরে বন্ধ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার হাসকিং মিল

মাহিদুল ইসলাম রিপন দিনাজপুর প্রতিনিধি : বাজারে অটোরাইস মিলের পলিস করা চকচকে চালের কাছে হেরে যাচ্ছে হাসকিং মিলের তৈরী লালচে চাল। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট, পুঁজির অভাবসহ নানান সংকটের কারনে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধানের জেলা দিনাজপুরে দিনে দিনে বন্ধ হচ্ছে হাসকিং মিলগুলো। 
 
দিনাজপুর জেলায় গত ৬ বছরে বন্ধ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার হাসকিং মিল। 
 
ধানের জেলা খ্যাত দিনাজপুরে বানিজ্যিকভিত্তিতে হাসকিং মিল বা ছোট চালকলের যাত্রা শুরু হয় ৮০’র দশকে। দিনাজপুর ছাড়াও ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসব চালকলে ধান আসতো। ২০০০ সালের পর থেকে এ ধরনের চালকলের সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে জৌলুস হারাতে বসে শিল্পটি। শ্রমিক ও পুঁজির সংকট, চকচকে চালের চাহিদা ও বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এখন বিলীনের পথে এ শিল্প।
 
হাসকিং মিল : বাংলাদেশের প্রচলিত পদ্ধতির ছোট বা মাঝারী চাল কলকে বোঝায়। ধান সেদ্ধ করা, শুকানো এবং মেশিনে ভাঙিয়ে খোসা ছাড়িয়ে চাল তৈরী করা হয়। এর চাল সাধারণত অটোরাইস মিলের অতিরিক্ত পলিস করা চালের মতো চকচকে নয়, কিছুটা লালচে ও খসখসে থাকে।
 
সম্প্রতি দিনাজপুর সদর, বিরল, বোচাগঞ্জ ও বীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন মিল ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ হাসকিং মিল বন্ধ। এসব মিলের ধান ভেজানোর হাউসগুলো পড়ে আছে খালি, মিলের বয়লারসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি নেই বললেই চলে। পড়ে আছে শুন্য। আর ধান শুকানোর চাতালগুলোতে শুকানো হচ্ছে ভুট্টা বা অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী। 
 
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার আজিমপুর গ্রামের হাসকিং মিল মালিক বিশ্বনাথ রায় জানান, নব্বইয়ের দশকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মিলটি। প্রথম অবস্থায় ভালোই চলতো। কিন্তু এখন শ্রমিক সংকট, অটোরাইস মিলের চালের চাহিদাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারনে তার মিলটি দশ বছর ধরে বন্ধ।
 
দিনাজপুর সদর উপজেলার রানীগঞ্জ এলাকার একটি হাসকিং মিলের উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান জানান, ১৯৯০ সালের দিকে প্রায় ২ একর জমিতে হাসকিং মিল গড়ে তুলেন। এক সময়ের জমজমাট মিল এখন শ্রমিক সংকটে ধুঁকছে। হাফিজুর রহমান বলেন, এখন অবস্থা খুবই খারাপ। এখন কারেন্টের বিলটা যে আমরা দেই সেটাও লস। মিস্ত্রি পাওয়া যায় না। মিস্ত্রি আমরা রাখতে চাচ্ছি, কিন্তু মানুষ কি ধান ক্রাসিং করবে? উনার বেতনটা হোক, তাওতো মিলটা হেফাজতে থাকবে। কিন্তু ধান ক্রাসিং করে যে পয়সা পাওয়া যায়, ওই পয়সায় মিস্ত্রির সংসার চলবে না।
 
তিনি বলেন, শ্রমিকরা এখন চালকলে কাজ না করে ইজিবাইক চালাচ্ছে বা অন্যকাজ করছে। এছাড়াও অটোরাইস মিলে কাজ করে দিনে এক হাজার টাকা পায়। এ জন্য হাসকিং মিলে শ্রমিকরা আর কাজ করতে চায়না। বাধ্য হয়েই মিলটি বন্ধ রেখেছেন।
 
পারিবারিক ব্যবসা ধরে রাখতে না পারার হতাশায় ভুগছেন হাফিজুর রহমানের ছেলে সেলিম হোসেন। সেলিম হোসেন জানান, হাসকিং মিলের চাতালের কিছু সংস্কার করে এবং ভুট্টা শুকিয়ে তারা লাইসেন্স টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। সেলিম হোসেন বলেন, আমার বাবা যখন মিল চালু করে, তখন ১’শ মন ধান ক্রাসিং করতে ২৫০ টাকা শ্রমিককে দিতো। কিন্তু এখন সেই ১’শ মন ধানের চাল তৈরী করতে ৪৫০০ টাকা দেই। তারপরও শ্রমিক কাজ করতে চায় না। যার কারনে আমাদের জ¦ালানী খরচ, শ্রমিক খরচ, মিস্ত্রির বেতন দিয়ে আমরা এই হাসকিং মিলকে এগিয়ে নিতে যেতে পারছি না।
 
জেলা খাদ্য বিভাগের হিসাব আনুযায়ী, ২০১৯ সালে দিনাজপুরে ২ হাজার ১৮০টি হাসকিং মিল চালু ছিলো। যা ২০২৫ সালে ৭০৩টিতে নেমে গেছে। অর্থ্যৎ দিনাজপুরে ৬ বছরে হাসকিং মিল কমেছে ১ হাজার ৪৭৭টি। কাগজে-কলমে কিছু মিল চালু থাকলেও সেগুলোতে এখন আর উৎপাদন হয় না।
 
এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, ভোক্তারা এখন হাসকিং মিলের চালের চাইতে অটোরাইস মিলের চাল পছন্দ করছে। এতে হাসকিং মিলের উৎপাদিত চাল বাজারে বিক্রি না হওয়ার কারনে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হাসকিং মিল মালিকরা নিজেরাই বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, অটোরাইস মিল মালিকরা ব্যাংক থেকে অনেক বেশী ঋন নিয়ে বেসরকারী মার্কেটে তাদের সবার নিজের ব্র্যান্ড না থাকার কারনে তাদের চালের চাহিদাটাও সীমিত। এতে তারা ব্যাংকের ঋন পরিশোধের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছে। যার প্রেক্ষিতে শিল্পটাও আস্তে আস্তে রুগ্ন হয়ে পড়ছে। 
 
বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, কর্পোরেট লেভেলে আর্থিক সক্ষমতা অনেক বড়। তাছাড়া তাদের উন্নত প্রযুক্তির কারনে উৎপাদন খরচটা কম। তিনি বলেন, কালের বিবর্তে হাসকিং হারিয়ে যাচ্ছে, মেজরে এসেছে। মেজরের পর অটো। একটা অটোরাইস মিলে যেমন ৩০টি হাসকিং মিলের ক্যাপাসিটি আছে, ঠিক এরকম ২০-৩০টা অটোরাইস মিল নিয়ে একটি কর্পোরেট লেভেলের ইন্ডাস্ট্রী তৈরী হচ্ছে। এতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে ছোট রাইস মিলগুলো।
 
নানান প্রতিকুলতার মধ্যে কিছু হাসকিং মিল এখনও টিকে আছে। সেরকমই একটি হলো দিনাজপুর সদর উপজেলার পুলহাট খোয়াড়ের মোড় এলাকার মজিবুর রহমানের মিল। তিন দশক ধরে এই ব্যবসায় আছেন ৭৫ বছর বয়সী এই উদ্যোক্তা। মজিবুর রহমান বলেন, হাসকিং মিলের চালটা আমরা যেভাবে তৈরী করি, এই চালের ভাত অনেক মোলায়েম হয় আর খেতেও স্বাদ হয়। পক্ষান্তরে অটোরাইস মিলের চাল শক্ত হয়। 
 
তিনি বলেন, হাসকিং মিলের চাল ৬ থেকে ৮ মাস রাখলেও নষ্ট হবে না। পক্ষান্তরে অটোরাইস মিলের চাল ২ মাস রাখলেই পোকা ধরে।
 
তিনি বলেন, অটোরাইস মিলের চাল পলিস করায় চালের গুনগত মান হারিয়ে যায়। কিন্তু হাসকিং মিলের চাল কিছুটা লালচে হলেও এখানে চালের গুনগত মান অক্ষুন্ন থাকে। এজন্য যারা এটি বোঝেন, তারা এখনও হাসকিং মিলের চাল পছন্দ করেন।
 
 
 
 
 

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন