নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ব্যর্থতায় বিমা খাতে আস্থার সংকট: প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বিমা খাতে বিরাজমান দীর্ঘমেয়াদি জনআস্থার সংকটের জন্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাঠামোগত ও তদারকি দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ টিটুমির। তিনি বলেন, বিমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের অধিকার ও সমতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, যার চূড়ান্ত খেসারত হিসেবে পুরো শিল্পে জবাবদিহিতার তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শনিবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ইনস্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা এবং করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিমা খাতের এই স্থবিরতা কাটাতে দেশের শীর্ষ নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও শিক্ষাবিদদের উপস্থিতিতে সেমিনারে বিমা খাতের কাঠামোগত ত্রুটি, স্বল্প প্রসারের হার এবং জরুরি নীতি সংস্কারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ টিটুমির তাঁর বক্তব্যে চলতি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিমা খাতের মন্থর গতি কাটিয়ে উঠতে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক নিয়ামক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও এখানে কৃষি বিমার প্রসার অত্যন্ত সীমিত। বিমা কোম্পানিগুলো একে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মনে না করায় কৃষকদের এই বিশাল ঝুঁকি সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আর মেনে নেওয়া যায় না। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিমাকে কেবল উচ্চবিত্ত বা করপোরেট গ্রুপগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, পণ্যের বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিমা খাতের সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হলে পরিচালন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে, আর্থিক অনিয়ম বন্ধ হবে এবং প্রশাসনিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে তিনি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বাজার-ভিত্তিক তদারকি মডেলের প্রস্তাব করেন, যেখানে নিরীক্ষক, জরিপকারী এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির মতো তৃতীয় পক্ষের বাজার নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা আরও সক্রিয় ও কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নবনিযুক্ত চেয়ারপারসন মীর নাদিয়া নিভিন এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট তিন-স্তরের সংস্কার কাঠামো ঘোষণা করেন। তিনি জানান, জীবন ও সাধারণ বিমা মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বিশাল বকেয়া বিমা দাবি ঝুলে রয়েছে, যা দ্রুত নিষ্পত্তি করাই তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার। এই মহাপরিকল্পনার প্রথম স্তরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পলিসিহোল্ডার বা বিমা গ্রাহকদের হারিয়ে যাওয়া আস্থা সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করার ওপর। এরপর দ্বিতীয় স্তরে বিমাকে একটি নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বা তৃতীয় স্তরে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মীর নাদিয়া নিভিন জানান, বকেয়া পাওনা পরিশোধের জন্য সম্পদ তরলীকরণ এবং আটকে থাকা তহবিল উদ্ধারে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কর্তৃপক্ষ। তিনি আরও প্রকাশ করেন যে, সমস্ত অভ্যন্তরীণ চেষ্টার পরও যদি বিপুল দায় থেকে যায়, তবে আইডিআরএ সরকারের কাছ থেকে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তা চেয়ে প্রস্তাব করতে পারে। তবে এই প্রণোদনা হবে অত্যন্ত শর্তসাপেক্ষ। বিমা কোম্পানিগুলোকে কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ত্রুটিহীন করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন তারল্য সংকট আর না ঘটে। এ ছাড়া ক্ষুদ্রবিমা, জলবায়ু-ঝুঁকি বিমা এবং তাকাফুল বা ইসলামি বিমা কাঠামোর জন্য নতুন নির্দেশিকা তৈরি করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
সেমিনারে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ, এমপি, দাবি করেন যে বিমা খাতের commission কাঠামোকে সব ধরনের ব্যবসায়িক অনিয়ম ও করপোরেট অসঙ্গতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমে প্রায়ই দাবি পরিশোধে বিলম্বের বিষয়টি হাইলাইট করা হলেও, অনেক দক্ষ কোম্পানি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৈধ দাবি নিষ্পত্তি করছে। সমালোচনার পাশাপাশি এই ইতিবাচক দিকগুলোও জনসাধারণের সামনে আসা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, দেশের অর্থনীতি বড় হলেও বিমা খাত চরম অবহেলার শিকার। তিনি স্বল্পমেয়াদি মুনাফা লাভের মানসিকতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনার অভাবকে এই খাতের মূল অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। অতীত তদারকির সমালোচনা করে কর্ণফুলী ইনস্যুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল বলেন, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় একসাথে ১৩টি বিমা লাইসেন্স দেওয়া এই খাতের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। জেনিথ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম নুরুজ্জামান জানান, সাধারণ বিমার চেয়ে জীবন বিমা খাত গভীর কাঠামোগত সংকটে রয়েছে, যা উত্তরণে ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা এবং দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) সভাপতি মনির হোসেন। প্রবন্ধে একটি বড় কাঠামোগত বৈষম্য তুলে ধরে দেখানো হয় যে, বর্তমানে বাংলাদেশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকারে বৈশ্বিকভাবে ৩৫তম স্থানে থাকলেও বিমা খাতের দিক থেকে রয়েছে ৬০তম অবস্থানে। এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মূল প্রবন্ধে জাতীয় বিমা নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন, ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকি সম্প্রসারণ, সেবার মানের ওপর ভিত্তি করে বিমা কোম্পানিগুলোর ক্যাটাগরি নির্ধারণ এবং আইডিআরএ-র জনবল বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়। প্রবন্ধের সমাপ্তিতে বলা হয়, সংবাদমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে গণমাধ্যম, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং বিমাকারীদের একটি সম্মিলিত ত্রিমুখী প্রয়াসের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

