ডার্ক মোড
Sunday, 25 October 2026
ePaper   
Logo
ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা খুলেছে উপকূলের নতুন সম্ভানারদ্বার

ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা খুলেছে উপকূলের নতুন সম্ভানারদ্বার

সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)

ঢাকার অদূরে বরগুনার বেতাগীতে ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা গ্রীন লিভ ফ্যাশনে
কর্মব্যস্ততায় পোশাক কর্মীরা।

ঢাকার অদূরে কৃষিনির্ভর বরগুনার বেতাগীতে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা
মানুষের নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন উৎস তৈরি করেছেÑ যা গ্রামীণ উন্নয়ন
ও অর্থনীতি চাঙা করে তুলবে।

দেশের উপকূলীয় এ জনপদে কোনো শিল্পাঞ্চল না থাকা সত্ত্বেও, উদ্যোক্তাদের
নিজস্ব উদ্যোগে ও স্থানীয় পুঁজিতে গড়ে ওঠা মিনি পোশাক কারখানা বিশেষ করে
গ্রামীণ নারী ও তরুণদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ অত্যন্ত
ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেখানে কাজের সন্ধানে রাজধানী ঢাকা, সাভার, গাজীপুর
কিংবা চট্টগ্রামে পাড়ি জমাত। তবে বর্তমানে সে চিত্র পাল্টে দিয়ে উপজেলা
সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্তপল্লী বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের কাজীর
হাঁটের তুলতলা এলাকায় এখন ছোট আকারের মিনি পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছেÑ যা
স্থানীয় পর্যায়েই আয়ের নতুন উৎস তৈরি করেছে।
স্থানীয়রা জানান, একটি পৌরসভাসহ ৭টি ইউনিয়নের সন্বয়ে গঠিত দেড় লাখ
জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২০২৫ সালে কারখানাটির গোড়াপত্তন
হলেও চলতি বছর থেকে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় তরুণ ও
নারীদের ওপর। তৈরি করেছে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন সুযোগ।
পোশাক কারখানা গ্রীন লিভ ফ্যাশনের তথ্য মতে, কারখানায় কর্মরত ২৫ জন পোশাক
শ্রমিকের বড় একটি অংশই নারী। এদের মধ্যে রয়েছে বিধবা, তালাকাপ্রাপ্তা ও
প্রতিবন্ধী। ঘরে বসে থাকা কিংবা অনগ্রসর নারীরা এখন সেলাই, কাটিং ও
প্যাকিংয়ের কাজ শিখে কারখানায় নিয়মিত কাজ করছেন।
সরজমিনে দেখা যায়, যারা এতদিন অসহায় ও অবহেলিত ছিল ক্ষুদ্র এই পোশাক
কারখানার সুবাদে তাদের মাঝে এখন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। এতে করে তারা
ঘরে বসেই প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আয় করছেন যা তাদের
পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বাধীন করে তুলছে।
পোশাক শিল্পে কর্মরত রোকসানা আক্তার জানান, গ্রামীণ নারীরা (যারা) আগে
ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রামের মতো বড় শিল্পাঞ্চলে গিয়ে কাজ করতে পারতেন না,
তারা এখন বাড়ির কাছেই কাজ পাচ্ছেন।
পাশাপাশি চাঙা হচ্ছে স্থানীয় বাজার ও অর্থনীতি। কারখানার কাঁচামাল
পরিবহন, আনুষঙ্গিক সূতা-বোতাম আপাতত ঢাকা থেকে সরবরাহ করা হলেও এখানকার
শ্রমিকদের দৈনিক চাহিদার কারণে এলাকার মুদি দোকান থেকে শুরু করে সব ধরনের
ব্যবসা-বাণিজ্যে কেনাবেচা বেড়েছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব, বেতাগী উপজেলা শাখার সভাপতি
সহকারী অধ্যাপক আবুল বাসার খান বলেন, এখানের উৎপাদিত পোশাক সহজে বড় শহরে
বা বাজারে নেওয়ার মতো উন্নত বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় বড় ব্যবসা গড়ে তোলা
কঠিন হলেও ক্ষুদ্র এই পোশাক কারখানায় কম খরচে পোশাক উৎপাদনের কারণে
সাধারণত স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক তৈরির ফলে কম আয়ের
মানুষ খুব সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় পোশাক কিনতে পারছেন।
এছাড়াও বেতাগী পৌর শহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আ. আজীজ হাওলাদার জানান,
আগামীতে ঈদ, পূজা, বড় দিন ও বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারে
এই মিনি কারখানার তৈরি পোশাকের বিপুল চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেন, সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগের ফলে আগামীতে এলাকায়
সুতা, কাপড়, বোতাম, দর্জি সামগ্রী এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের স্থানীয়
বাজার গড়ে উঠবে। এতে করে ছোট ছোট ব্যবসায়ী এবং বাজারের দোকানদাররাও
লাভবান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনবে।
উপজেলার উত্তর করুণা গ্রামের বাসিন্দা ও পোশাক করাখানায় কর্মরত শ্রমিক
তানিয়া বেগম বলেন, ‘এই ক্ষুদ্র কারখানাটি আমার মতো অসহায় গ্রামীণ নারীর
কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিযেছে। এর ফলে, আমরা বলতে গেলে ঘরে বসেই অর্থ
উপার্জন করতে পারছিÑ যার ফলে, আমাদের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি ও
নারী ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত করছে।’
পোশাক কারখানায় কর্মরত স্থানীয় যুবক এইচ এম মনিরুল ইসলাম মনে করেন, ‘তরুণ
ও যুবকদের জন্য এটি আয়ের একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের বড় বড়
গার্মেন্টসে না গিয়ে নিজ এলাকাতেই কাজের সুযোগ পাওয়ায় গ্রামীণ যুবকদের
শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে।’
স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে এই
ক্ষুদ্র পোশাক শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, কারখানায়
যুক্ত করা কর্মীদের আধুনিক সেলাই ও ডিজাইনের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান,
ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের
ব্যবস্থা এবং সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আগামীতে আরও বড় বাজার ধরতে সক্ষম ও
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চালিকাশক্তি হতে পারে।
আশার কথা, ঢাকা বা সাভারের পোশাক কারখানায় কাজ করে আসা অনেক দক্ষ শ্রমিক
বা উদ্যোক্তা এখন গ্রামে ফিরে এসে অল্প পুঁজি নিয়ে এই মিনি গার্মেন্টস
ব্যবসা শুরু এবং বড় শহরের তুলনায় উৎপাদন খরচ ও পরিবহন খরচ কম হওয়ায়
স্থানীয় সাধারণ মানুষ সুলভ মূল্যে পোশাক ক্রয় এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা
মেটাতে পাইকারি ও খুচরা পোশাকের জোগান দিতে পারবেন।
এই ক্ষুদ্র পোশাক কারখানার উদ্যোক্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলে
জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে যদি সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি
সহায়তা পাওয়া যায়, তবে ক্ষুদ্র এই কারখানাটি আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া
সম্ভব বলে তারভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি মনে করেন, বেতাগীর এই মডেলটি পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন
ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি রোল মডেল হতে পারে।
আত্মকর্ম-সংস্থানমূলক ও গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে দেওয়া এই উদ্যোগের বিষয়ে
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ. সাদ্দাম হোসেন অত্যন্ত ইতিবাচক ও সব
ধরনের সহায়তামূলক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ঘরের কাজ সামলে
গ্রামীণ নারীরা যখন বাড়ির পাশেই সম্মানজনক আয়ের সুযোগ পাওয়ায় সমাজে তাদের
মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এতে শহরের দিকে কাজের সন্ধানে মানুষের ছুটে যাওয়ার
প্রবণতা কমবে এবং তৃণমূল পর্যায়েই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

 
ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা খুলেছে উপকূলের নতুন সম্ভানারদ্বার

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন