আইস কর্মকর্তাদের গুলিতে টেক্সাসের হিউস্টনে মেক্সিকান নাগরিকের মৃত্যু, ‘হত্যাকাণ্ড’ বলল মেডিকেল এক্সামিনার
যুক্তরাষ্ট্র ব্যুরো
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে দেশটির অভিবাসন ও কাস্টমস প্রয়োগকারী (আইসিই) সংস্থার কর্মকর্তাদের গুলিতে লরেঞ্জো সালগাদো আরাউজো নামের এক মেক্সিকান নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। হ্যারিস কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনার এই ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হত্যাকাণ্ড’ (হমিসাইড) বলে রায় দিয়েছেন।
ময়নাতদন্তের রেকর্ড অনুযায়ী, ৬৮ বছর বয়সী এই মেক্সিকান নাগরিকের শরীরের উপরিভাগে (টরসো) গুলির ক্ষত পাওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে।
মেডিকেল এক্সামিনারের এই সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। মানবাধিকার কর্মী, নিহতের পরিবার ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিবৃতির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৬টা ৫০ মিনিটে পূর্ব হিউস্টনের ৬৮০০ ব্লকের ক্যানাল স্ট্রিটে এই গুলির ঘটনা ঘটে। আইসিই কর্মকর্তারা জানান, লরেঞ্জো সালগাদোকে গ্রেফতারের জন্য তারা একটি ‘টার্গেটেড এনফোর্সমেন্ট অপারেশন’ চালাচ্ছিলেন। আইসিই’র দাবি, লরেঞ্জো তাদের একটি গাড়িকে ধাক্কা দেন এবং এক কর্মকর্তাকে গাড়ি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। আত্মরক্ষার্থেই তখন আইসিই কর্মকর্তা গুলি চালাতে বাধ্য হন। পরে বেন টব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তবে নিহতের পরিবার এবং স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো ফেডারেল সংস্থার এই দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
মার্কিন কংগ্রেস সদস্য সিলভিয়া গার্সিয়া প্রকাশ্য এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, লরেঞ্জো সালগাদো মূলত এই অভিযানের মূল লক্ষ্য বা টার্গেট ছিলেন না। নিহতের ছেলে তাকে একজন ‘কঠোর পরিশ্রমী মেক্সিকান নাগরিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ঘটনার পর শত শত স্থানীয় বাসিন্দা হিউস্টনের রাস্তায় নেমে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
বডি ক্যামেরা না থাকায় রাজনৈতিক বিতর্ক
বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার তারা নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট আইসিই কর্মকর্তাদের শরীরে কোনো ‘বডি ক্যামেরা’ (বিডব্লিউসি) ছিল না।
ডিএইচএস এই সরঞ্জামের ঘাটতির জন্য বাজেট পাসের ক্ষেত্রে সরকারি অচলাবস্থাকে (গভর্নমেন্ট শাটডাউন) দায়ী করেছে।
এক বিবৃতিতে তারা জানায়,
"একাধিক সরকারি অচলাবস্থার কারণে সব আইসিই ফিল্ড অফিসে বডি ক্যামেরা কেনা এবং বিতরণের প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়েছিল।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইতিমধ্যে অর্ধেক ফিল্ড অফিসে ক্যামেরা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং হিউস্টনসহ বাকি অফিসগুলোতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এই ক্যামেরা সরবরাহ করা হবে। একই সাথে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ১,৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এনেছে সংস্থাটি।
তদন্তে নামছে একাধিক পক্ষ :
অভিযুক্তরা ফেডারেল কর্মকর্তা হওয়ায় আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে হিউস্টন পুলিশ সরাসরি এই ঘটনার তদন্ত করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন মেয়র জন হুইটমায়ার। তবে নগর কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা এবং তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
স্থানীয়ভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হ্যারিস কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি শন টেয়ার একটি সমান্তরাল ও স্বাধীন তদন্ত শুরু করেছেন।
বৃহস্পতিবার ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখেছেন। স্থানীয় প্রশাসন প্রত্যক্ষদর্শীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সাথে তিনি তার দেশের নাগরিকের মৃত্যুর পেছনে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একটি কঠোর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

