ডার্ক মোড
Thursday, 13 June 2024
ePaper   
Logo
তাপদাহ থেকে পরিত্রাণে নারী শিশু ও বয়স্কদের জন্য করণীয়

তাপদাহ থেকে পরিত্রাণে নারী শিশু ও বয়স্কদের জন্য করণীয়

ফারিহা হোসেন

বৈশ্বিক উষ্ণায়নরে কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের চিরাচরিত গতি প্রকৃতি বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। একই সঙ্গে বায়ুমন্ডলে কার্বন নি:সরন বৃদ্ধিতে গলছে বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলের পাহাড়, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী, বর্তমান সময়ে দেশের স্বরণকালের ভয়াবহ তাপ দাহের কারণও মূলত: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। পাশাপাশি পাহাড়-বন, বৃক্ষ নিধন, বন উজাড়, নদী খাল বিল দখল, ভরাট থাকায় পরিস্থিতিকে আরো ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসবের বিরুপ প্রভাব শুধু জলবায়ু পরিবর্তন ঘটাচ্ছেনা একই সঙ্গে কৃষি,খাদ্য উৎপাদনকে ব্যহত করছে এবং জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এমনি অবস্থায় গত প্রায় মাস ধরে দেশব্যাপী চলছে তীব্র তাপদাহ। তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলছে। দেশজুড়ে বয়ে যাওয়া এই তাপদাহে মানুষের মৃত্যুও ঘটনাও ঘটছে। তাপমাত্রার এমন পরির্বতন এখন যে হচ্ছে তা নয়, গত কয়েক বছর ধরে তা হচ্ছে তবে এবার এর প্রভাব,স্থায়ীত্ব বেশি হওয়ায় বিষয়টি গুরত্ব পাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চলমান তাপপ্রবাহ আরও সপ্তাহ খানেক থাকবে।

তবে তাপমাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্ক রয়েছে। এখন সারাদেশে জরুরি ‘হিট এ্যালার্ট’ অব্যাহত আছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার বার্তা দিয়েছে সংস্থাটি। তীব্র গরমে পানির চাহিদা বেড়েছে। এ সময় তাপ এড়িয়ে ঠান্ডা স্থানে থাকতে হবে। তরল এবং ঠান্ডা জাতীয় খাবার খেতে হবে। বায়ুতে জলীয়বাষ্প বেশি থাকার কারণে অস্বস্তি বেড়েছে। একইসঙ্গে সমুদ্রের লঘুচাপ পশ্চিমবঙ্গ ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করায় এ অঞ্চলের তীব্র তাপদাহের প্রভাব দেখা যাচ্ছে ভ‚পৃষ্ঠে। এর আগে দেশে ১৫ থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত লাগাতার তাপপ্রবাহ থাকার রেকর্ড থাকলেও এবার চলতি মাসের সম্পূর্ণ সময়টুকু জুড়েই টানা তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকের সূর্যের তাপও।

তাপমাত্রা যতই থাকুক অনুভ‚ত হচ্ছে তার চেয়েও বেশি। এই মৌসুম ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম। ঝড়-বৃষ্টি হতেই থাকবে। তবে ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ যদি পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে গরম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। তখন জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়বে। গরমে অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, হাসপাতাল, নির্মাণ কাজ সবকিছুই চরমভাবে বিঘিœত। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ, রিকশা চালক,পথ শিশু, হকার, ফেরিওয়ালাদের জীবনে যেন এই তাপদাহ প্রাণনাশি হুমকি হয়ে নেমে এসেছে। চলমান তীব্র তাপদাহের কারণে সারা দেশে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা ছুটি ছিল প্রায় এক সপ্তাহ। এই তীব্র তাপমাত্রা বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের নিয়ামকের জন্য একটি বিরাট বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এর সমাধানে বৈশ্বিক আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তবে, সবার আগে প্রয়োজন অধিক পরিমাণে সবুজায়ন, বনায়ন ও জলাভ‚মি সৃষ্টি ও সংরক্ষণ।

সূর্যের অবিরাম তাপ থেকে বাঁচতে যখন অনেকে তাদের অফিস বা বাড়ির ছায়ায় আশ্রয় খোঁজে, তখন আবার অনেকেই কাঠ ফাটা রোদে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-মজুরের কাজ করছে। ফলে এই শ্রেণি পেশার মানুষ এই তাপদাহে কাবু হচ্ছে বেশি। ফলে তারা দুর্বল এবং অপুষ্টিতে আক্রান্ত শরীরের সাথে লড়াই করে বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছে। বিশেষ করে জ্বর, সর্দি, কাশি, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডিহাইড্রেশন এবং হিটস্ট্রোকের মতো জটিল অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে। তবে নারী শিশু,বয়স্করা অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, দুপুর ১১ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত এই সময়ে সূর্য মাথার উপরে থাকে বিধায় প্রখর রোদ থাকে, তাই এই সময়টিতে খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে। এই তাপদাহ মানব শরীরের উপযোগী নয়।

এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। অনেকে গরম সহ্য করতে না পেরে হিটস্ট্রোকে মৃত্যুবরণও করছেন। শুরুতে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ থাকলেও ক্রমে তা তীব্র থেকে অতি তীব্র হয়ে উঠেছে। এমনিতে এপ্রিল বছরের উষ্ণতম মাস; তবে অন্যান্য যেকোনো বছরের চেয়ে অনেক বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে এবারের মাসটি। অসহনীয় গরমে এক পশলা বৃষ্টির জন্য হাঁসফাঁস করছে জনজীবন। বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষের শরীরও গরম হয়ে যায়। এর ফলে রক্তনালীগুলো খুলে যায়।

এর জের ধরে রক্ত চাপ কমে যায় যে কারণে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করা হৃদপিন্ডের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আর রক্তচাপ খুব বেশি কমে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। আগে আমরা ঋতু ধরে বলতে পারতাম কখন কী হবে। কিন্তু এখন সেটা বলা সম্ভব নয়। এটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে না, সারা বিশ্বেই এমন অবস্থা। এ জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এ জন্য প্রধানতম দায়ি। আরেকটা বিষয় হলো শিল্পায়নের আগে যে তাপমাত্রা ছিল, শিল্পায়নের পর তাপমাত্র এক থেকে দেড় ডিগ্রী বেড়ে গেছে। ফলে বিশ্ব ক্রমশ যে উষ্ণতার দিকে যাচ্ছে, সেটা তো আগে থেকেই ধারণা করা হয়েছিল। এখন তাই হচ্ছে।

চলমান এই তাপপ্রবাহসহ জলবায়ু পরিবর্তনের আরও ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুদের রক্ষা করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়। অস্বাভাবিকভাবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায়, আমাদের আগে শিশু ও সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে রাখার প্রতি নজর দিতে হবে।

বিশেষ করে নবজাতক, সদ্যোজাত ও অল্পবয়সি শিশুদের জন্য। হিট স্ট্রোক ও পানি শূন্যতাজনিত ডায়রিয়ার মতো, উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে সৃষ্ট অসুস্থতায় শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। এছাড়াও আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি, যেমন শিশুরা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের বসা ও খেলার জন্য ঠান্ডা জায়গার ব্যবস্থা করে দেওয়া। তপ্ত দুপুর ও বিকেলের কয়েক ঘণ্টা তাদের বাড়ির বাইরে বেরোনো থেকে বিরত রাখা। শিশুরা যেন হালকা ও বাতাস চলাচলের উপযোগী পোশাক পরে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সেই সঙ্গে সারা দিন তারা যেন প্রচুর পানি পান করে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় অতিরিক্ত ঘামের জন্য শরীর থেকে প্রয়োজনীয় লবণ ও খনিজ পদার্থ বের হয়ে যায়। প্রচুর পানি, পানীয়, স্যালাইন, শরবত, তাজা রসালো ফল, বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। প্রখর রোদ থেকে রক্ষা পেতে ছাতা, হ্যাট/ক্যাপ ও সানগ্লাস ব্যাবহার করতে হবে। একটানা দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ে আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছুটা মানবিকতার আচরণ করতেই পারি। সারাদিন রোদে খেটে খাওয়া মানুষদের পারিশ্রমিক সাধ্য অনুযায়ী বাড়িয়ে দিতে পারি।

রিকশা চালক বা এই শ্রেণির জনগোষ্ঠীর ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে দিলে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবো না আমরা কেউই। সামান্য কিছু খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয়জলের ব্যবস্হা করতে পারি। ইতোমধ্যেই এমন অনেক নজির দেখতে পাওয়া গিয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। যে যেমনভাবে পারছে সাধ্যমতো চেষ্টা করে নিজ নিজ বাসার সামনে ছায়ায় বসার ও বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছে, খাবারের পানির ব্যবস্থা পর্যন্ত আছে। বাদ যায় নি আমাদের সহানুভ‚তি প্রাণিদের প্রতিও। প্রাণিদের এই তীব্র গরমে পানির এবং অন্তত পক্ষে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সুপেয় জায়গা করে দিয়েছে অনেকেই। চলমান এই গতিশীলতাকে স্বাভাবিক রাখতে আমাদেরও এই দুর্দশার জীবনের সাথে খাপ খায়িয়ে নিতে হবে। মানিয়ে নিতে হবে এ আবহাওয়া এবং ধরে নিতে হবে এটা এক যুদ্ধই। টিকে থাকতে হবে নিজের শিকড় মজবুত করে আঁকড়ে ধরে।

আমরা কিন্তু এখনই ভবিষ্যতের একটা ডেমো দেখতে পাচ্ছি। ঋতুর পরিবর্তন হচ্ছে। গরম দীর্ঘ হয়ে গেছে। বর্ষা সংক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তাপপ্রবাহর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে, সাথে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া উৎপাদনশীল খাত কৃষিতে বড়ো ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বনভ‚মি ধ্বংস এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বর্তমান সময়ে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হচ্ছে, তা শুধু একটি সতর্কবার্তা। দ্রুত বনায়ণের কাজ শুরু করতে হবে। সেই সাথে প্রকৃতি বান্ধব জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে। বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ওই গবেষণায় ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের প্রতিদিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

সেখানে দেখা গেছে, বিভিন্ন ঋতুতে তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায় ক্রমেই জলবায়ু পরিস্থিতি উষ্ণ হচ্ছে। সব ঋতুতেই তাপমাত্রা আগের চেয়ে বাড়ছে। মনে রাখতে হবে, এই তাপদাহ চিরকালীন নয়। সবুজ শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বাংলাদেশ বইয়ের পাতায় শৈশবে পড়া দিনগুলিকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। প্রকৃতি সবুজ, বনবনানি, পাহাড় অরণ্য,নদী নালা খাল বিল অক্ষুন্ন রেখেই জীবনকে সাজাতে হবে তবেই রক্ষা পাওয়া যাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাব থেকে। এ জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, গৌষ্ঠী, স্থানীয়, রাষ্ট্রীয়, আন্তরাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ।

লেখিকা, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, শিক্ষার্থী-নর্থ সাউথ বিশ্ব বিদ্যালয়।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন