ডার্ক মোড
Thursday, 23 May 2024
ePaper   
Logo
আগুন নিভে গেছে লাশও দাফন হয়েছে

আগুন নিভে গেছে লাশও দাফন হয়েছে

মীর আব্দুল আলীম

আগুন নিভে গেছে, লাশের দাফন-কাফোনও হয়েছে। জনউত্তাপ আর প্রশাসনের হম্বিতম্বিও ফুরিয়েছে। অভিযান প্রায় শেষ। এখনসব ভুলে যাওয়ার পালা। আমরা রাজধানীর বেইল রোড়ের অগ্নিকান্ডের ঘটনার কথা বলছি। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে ইতোমধ্যে দায় শেষ করতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।

আমার প্রশ্ন আছে অনেক ট্রেডলাইসেন্স থেকে শুরু করছি। যিনি ট্রেডলাইসেন্স দিলেন তার কিন্তু লাইসেন্স দেবার আগে সব ঠিকঠাক আছে কিনা যাচাই বাছাই করবার কথা। সেটা বোধ করি করা হয়নি। রাজউকের যাচাই বাছাই তদরকি কি হয়েছিলো? হলে ভবনে অনিরাপদ ছিলো কেন? অনিরাপদ ঐ ভবন ফায়ার সাভিসের লাইন্সে পেলো কি করে? নিরাপদ সিঁড়ি নেই। এটি ভবনে এতোগুলো হোটেল রেস্তোরা; ছিলোনা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। কি করেছে সংশ্লিষ্টরা? এটাতো তাঁদেরই দেখার কথা ছিলো। কেউ তাঁদের স্বস্ব জায়গা থেকে কাজ করেনি। পয়সা পেয়ে অফিনে বসেই সব কাগজ ঝকঝকা করে নিয়েছে।

বেইলি রোড়ের আগুনে ৪৬ জন মানুষ মারা গেলো এর দায় কার ছিলো? উপরেউল্লেখিত সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো অবশ্যই দায়ি। এদের কারো বিরুদ্ধে কি মামলা হয়েছে? কেউ গ্রেফতার হয়েছেন? একজনও না। গোবেচারা ম্যানেজার আর কর্মচারিকে পিঠমোচড়া দিয়ে বেঁধে হাজতে পাঠানো হয়েছে। এদেশে এভাবে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে আর কত চাপানো হবে? আবারও হয়তো অপেক্ষা করছে এর চেয়েও বড় ধরনের দুর্ঘটনা। যারা প্রকৃত অপরাধী তাঁদের কঠিন সাজা আওতায় আনা হলে এজাতিয় অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা কমে আসতো।

ঢাকার অনিরাপদ অবৈধ ভবনগুলো টিকে আছে কি করে? রাজধানীর অধিকাংশ ভবনেই অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা নেই। এটা কি করে সম্ভব? বিল্ডিং কোর্ড আর নকশা না মেনেই হচ্ছে ভবন তাহলে আগুন লাগলে কিংবা ভুমিকম্প হলে মানুষতো মরবেই। আমাদের বড় একটা ব্যামো আছে। কোন কিছু ঘটে গেলে হৈ চৈ করি। আফসোস করি। কতদিন এটা নিয়ে হম্বিতম্বি হয়। তারপর শেষ। ভুলে যাই সব। রাজধানীর বেইলী রোডের রেস্তোরা থেকে আগুন লেগেছে আমরা ছুটছি সেই রেস্তোরা নিয়েই। প্রশাসন নড়ে চড়ে বসেছে। অবৈধ রেস্তোরা ভাঙ্গার কাজ চলছে রাজধানী জুড়ে। রাষ্ট্রের যারা এসব দেখার দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা এতোদিন এসব দেখেননি; তাঁরা তাদের দায়িত্ব পালন করেননি। আর এখন সব দায় পরছে ভবন মালিক আর রেস্তোরার মালিকদের ঘাড়ে। আইনের প্রয়োগ থাকলে আর আইন মানতে বাধ্য করা হলে এসব অনিয়ম থাকতো না; মানুষও এভাবে লাশ হতো না।

জাতীয় একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, পুরোনো ঢাকার পর রাজধানীর বনশ্রীতে আগুনের ঝুঁকি সবচাইতে বেশি। সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে- বনশ্রী ডি ব্লকের ৮ নাম্বার রোডের রেডিয়েন্ট কৃষ্ণচুড়ায় কন্ডেমিনিয়ামে রয়েছে তিনটি ১০তলা ভবন। এসব ভবনে ৯০টি পরিবারের প্রায় সারে ৮শ মানুষ বসবাস করেন। এই ভবনের মুল ফটকে বিশাল ক্যামিকেল গোডাউন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেও তারা কোন সরাহা পায়নি এভবনে বসবাসকারীরা। বাসিন্দাদের আরো অভিযোগ ভবনটি প্রতিষ্ঠার পর ফায়ার সার্ভিসের কোন ব্যক্তি এখানে অসেননি। এই হচ্ছে আমাদের আবাসিক ভবনগুলোর অবস্থা। নুন্যতম নিরাপত্বা নোই কোথাও। এমন ভবন গুলোতে আগুন লাগলে কি হবে? শততশত মানুষ লাশ হবে; আর আমরা আহ্ উহ্ করবো। এতোটুকুই!

সরকার যদি বাজধানীবাসিকে নিরাপদ করতে চায় ফায়ার সার্ভিসকে গতিশীল করতে হবে। আগুন লাগলে ছুঁটে যাবে এমনটা যেন না হয়। প্রতিটি ভবনে অগ্নিনিরাপ্তা আছে কিনা তা যেন তল্লাশী করা হয়। প্রতিটা ভবনে কিংবা কয়েকটা ভবন মিলে যেন বাসিন্দাদের আগুন লাগলে তাৎক্ষনিক কি করতে হবে তাঁর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের (অপারেশনস ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জাতীয় একটি দৈনিকে বলেন, “আমরা ভবনের মালিককে নোটিশ দিতে পারি। এ ছাড়া আর কিছু করার নেই। আমাদের আইনের মধ্যে যা যা করা সম্ভব, তা-ই করছি।” লেখাটা পড়ে হতভম্ব হয়েছি। এমন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কি করে এমন বক্তব্য দিতে পারেন। কেউ আইন না মানলে তাঁেক আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন যে নোটিশ দেওয়ার পরেও কাজ না হলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এইসব ভবনগুলোর একটির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলে বাকিগুলো এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে এজন্য ফায়ার সার্ভিস, রাজউক ও সিটি কর্পোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। নেই ঠিকঠাক জরুরি নির্গমন ব্যবস্থাও। সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা অনুসরণ না করে তৈরি হওয়া ভবনগুলো পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে! ফায়ার সার্ভিস বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে ভবন মালিকদের নোটিশ দিলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না ভবন মালিকরা। এমনকি নোটিশের জবাবও দেন না। ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণে নিয়ম না মানা এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা না মানার ফলে বারবার মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা ও সম্পদের ক্ষতি বেড়েই চলেছে। বছরে কয়েকশ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে অগ্নিকাণ্ডে। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও প্রতিকারে ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পথ এবং আগুন নেভানোর ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আগুন লাগলে মানুষ যাতে বেরিয়ে আসতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশস্ত সিঁড়ি এবং এক ভবন থেকে আরেক ভবনের প্রয়োজনীয় দূরত্ব রক্ষা করা জরুরি।

অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা থাকলেও তা মানছেন না সিংহভাগ ভবন মালিক। নগরীতে বেশিরভাগ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। অগ্নিনির্বাপণ আইনের তোয়াক্কা না করে নগরীতে ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে শত শত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। অগ্নিনির্বাপণ আইনে পরিষ্কার বলা আছে– ছয়তলার উপরে ভবনের ক্ষেত্রে তিন স্তরের নিজস্ব স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এছাড়া বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে প্রথম তলা থেকে তিন স্তরের এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার বিধান রয়েছে। বেশিরভাগ আবাসিক ভবনেই তিন স্তরের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। নিজস্ব অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা দূরে থাক, অনেক এলাকার সড়ক এত সরু, কোনো ভবনে দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশেরও সুযোগ নেই। ফলে প্রতিবছর অগ্নিকাণ্ডে প্রচুর পরিমাণ সম্পদহানি হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারা ও অর্থদণ্ডসহ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তির বিধানও রয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও এ আইন প্রয়োগের নিয়ম আছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সীমাবদ্ধতাসহ নানা কারণে এসব আইনের প্রয়োগ নেই।

নামমাত্র অনুমোদন নিয়ে বা না নিয়েই গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, মার্কেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অনিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কারণে নিয়ম না মানা ভবন মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর নির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভবন থেকে জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা আরও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এসব অসঙ্গতি দূর করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক, সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন