১৫ বছর ধরে ৮ আসনের টিকিটের হিসাব নেই, রাজস্ব হারাচ্ছে রেল!
এম আর আমিন, চট্টগ্রাম
বাংলাদেশ রেলওয়েতে যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, আয় বৃদ্ধি ও লোকসান কমানোর নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম, বিনা টিকিটে যাত্রী পরিবহন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ট্রেনের খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি এবং বিভিন্ন খাতে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রেলওয়ের সেবাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
দেশের সাধারণ মানুষের কাছে রেলপথ তুলনামূলক নিরাপদ যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম।
বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবায় নানা ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ বহু পুরোনো হলেও এবার টিকিট বিক্রিতে পুকুর চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
৬৮ ও ৬৪ সিটের শোভন শ্রেণির কোচের ৬০টি সিটের টিকিট বিক্রি হলেও বাকি সিটের টিকিটগুলো বিক্রি হয়না আবার সিটও খালী থাকে না। তাহলে প্রশ্ন আসে এসব সিটে কারা ভ্রমণ করেন আর দীর্ঘ ১৫ বছর পরিবহনের কোটি কোটি টাকা কার পকেটে যাচ্ছে? নাকি সবাই যার যার ভাগ নিয়ে না দেখার ভান ধরছেন?
জানা যায়, রেলে যুক্ত ১৯০০, ২০১৭, ২০২১, ৭০১৪, ৭০৫৫, ৭৫১৪, ৮৫০১ ও ৯৩৮৭ নং কোচগুলোর প্রতিটিতে ৬৮টি এবং ৭০০৪, ৭০০৮, ৭০৫৬ ও ৭০৬৩ কোচগুলোতে ৬৪টি করে করে শোভন শ্রেণির সিট রয়েছে। অনলাইনে বিক্রিত সিস্টেম অনুযায়ী প্রতি কোচে ৬০ টি সিট বিক্রি হলেও এসব কোচের অবশিষ্ট ৬৪টি সিটের টিকিট বিক্রি হয় না। প্রতি সিঙ্গেলে ৬৪টি সিট হিসেবে দৈনিক ২বার আসা যাওয়ায় (মোট ৪ বার) দৈনিক অবিক্রিত টিকিটের পরিমান ২৫৬টি। প্রতি সিটের মূল্য ১৫০ টাকা ধরা হলে দৈনিক লুটের টাকার পরিমান দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার। বছরে ৩০০ দিন ধরে (সরকারি বন্ধ ছাড়া) হিসেব করলে বিগত ১৫ বছরে এই খাত থেকে কমপক্ষে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যেহেতু টিকিট বিক্রি না হলেও এসব সিট কখনো খালি থাকে না নিয়মিত যাত্রী বহন করে এসব সিটে। সেই হিসেবে টিটিই’র মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হলে এই খাত থেকে যাত্রী বহনে গত ১৫ বছরে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা অর্থাৎ বছরে ২ কোটি টাকা আদায় করা যেত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এই পুরো টাকাটাই হারাচ্ছে রেলওয়ে। যদিও এই হিসাব একটি উদাহরণ মাত্র, তবুও এটি দেখায় যে কয়েকটি আসনের অনিয়মও দীর্ঘমেয়াদে কত বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
রেলওয়ের সাবেক কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, রেল একটি সেবামূলক সরকারি সংস্থা, নিরাপদ যাত্রীসেবা নিশ্চিতে প্রতি বছর ১৫শ কোটি টাকা (কম/বেশি) ভূর্তুকি দেয় সরকার। কতিপয় কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণে সরকারের এই বিপুল অর্থ লোকসান দিতে হচ্ছে। দুর্নীতির লাগাম টানতে পারলে ভূর্তুকির পরিমান অনেক কমানো যেত। কোচ সংস্কার, আসন পুনর্বিন্যাস বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে আসন সংখ্যায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি টিকিটিং সফটওয়্যার বা কেন্দ্রীয় ডাটাবেইসে হালনাগাদ না করা হয়,
বছরের পর বছর ধরে এমন অসংগতি থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি? সফটওয়্যার পরিচালনা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কি বিষয়টি জানতেন না, নাকি জেনেও কার্যকর ব্যবস্থা নেননি? পুরোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বহাল থাকার ফলে কারা সুবিধা পেয়েছেন? এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে সরকারের আর্থিকভাবে ক্ষতি হয়েছে কি না, স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষ সূত্র জানা যায় , রেলের টিকিট কালোবাজারি দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। ঈদ, পূজা বা অন্যান্য ছুটির মৌসুমে টিকিট সংকট যখন চরমে পৌঁছে, তখন অতিরিক্ত বা অঘোষিত আসনগুলো অসাধু চক্রের জন্য লাভজনক ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হয়। সরকারি বিক্রয় ব্যবস্থার বাইরে থাকা এসব আসন অনিয়মের সুযোগ আরো বাড়িয়ে দেয়।
রেলের টিটিই, স্টুয়ার্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মচারিরা এসব অতিরিক্ত সিটে প্রায়ই যাত্রীদের বসাচ্ছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অবিক্রিত দেখানো আসন বিশেষ সুবিধাভোগী ব্যক্তি, দালাল চক্র বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বরাদ্দ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একজন যাত্রী যখন নির্ধারিত ভাড়া দিয়ে টিকিট কিনতে ব্যর্থ হন, অথচ একই কোচে অতিরিক্ত আসনে অন্য কেউ ভ্রমণ করেন, তখন পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। শুধু তাই নয়, রেলওয়েকে প্রতি বছরই বিপুল অঙ্কের টাকা ভর্তুকি দেয় সরকার। সেই অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের প্রতিটি সম্ভাব্য উৎসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
যাত্রীর কাছ থেকে অর্থও আদায় করা হয় সেই অর্থ রাজস্ব খাতে জমা না হয়ে ব্যক্তিগত পকেটে জমা হয়,
এবিষয়ে জানতে চাইলে, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, ৬৮ সিট বা ৬৪ সিটের কোচের সংখ্যা খুব কম। এসব কোচ অতিরিক্ত হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ফলে কখন, কোন ট্রেনে লাগানো হবে তা আগে থেকে বলা মুশকিল। তাবে কিছু কোচে অতিরক্ত আসন থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, গত দুই মাস আগে আমরা এ কোচগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (DCO) চিঠি দিয়েছি। এসব কোচ যেসব আন্তঃনগর ট্রেনে সংযুক্ত করা হয়, সেই ট্রেনের সব কোচের আসন ট্রেন ছাড়ার দুই ঘণ্টা আগে গণনা করা হয়। অতিরিক্ত যে আসনগুলো থাকে, সেগুলোর বিপরীতে স্ট্যান্ডিং টিকিট হিসেবে কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এম আর মনজু বলেন, ”দেশের সরকারি সম্পদ হলো জনগণের সম্পদ। একটি আসনের ভাড়া যত সামান্যই হোক, হাজার হাজার ট্রিপে সেই অর্থই কোটি টাকায় রূপ নেয়। তাই প্রশ্ন উঠছে ৬৮ ও ৬৪ সিটের কোচে যদি ৬০টি টিকিট বিক্রি হয়, বাকি আসনের টাকা কোথায় যায়? তার স্বচ্ছ উত্তর এবং নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন
আপনি ও পছন্দ করতে পারেন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
আর্কাইভ!
অনুগ্রহ করে একটি তারিখ নির্বাচন করুন!
দাখিল করুন

