শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ভাইরাল, অভিযোগের তীর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দিকে
স্টাফ রিপোর্টার
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মো. হাসান শওকতের কার্যালয়ে ঘুষ লেনদেনের একটি গোপনে ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে।
আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ইইডির ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ধারণকৃত ওই ভিডিওতে দেখা যায়, হাসান শওকত তাঁর চেয়ারে বসে আছেন এবং তাঁকে ঘিরে ৬ থেকে ৭ জন ব্যক্তি অবস্থান করছেন। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা বড় বড় খাম থেকে ১,০০০ ও ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিল বের করে টেবিলের ওপর রাখছেন। এ সময় একজনকে স্পষ্ট বলতে শোনা যায়, "স্যারের কাছে ৫ লাখ টাকা রেখে দাও।"
ভিডিওটি ধারণের সঠিক তারিখ জানা না গেলেও নির্ভরযোগ্য অফিসিয়াল সূত্রে জানা গেছে, এটি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে শওকতের প্রায় আড়াই বছরের মেয়াদকালের ঘটনা। পরবর্তীতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান।
ভিডিওর বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাসান শওকত এর সত্যতা স্বীকার করে দাবি করেন, "আমার রুমে দুজন ঠিকাদার নিজেদের মধ্যকার একটি বিষয় মীমাংসা করছিলেন। ওই টাকা ঠিকাদারদের, এর সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।"
উল্লেখ্য, দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, ভবন নির্মাণ, সম্প্রসারণ, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং আসবাবপত্র সরবরাহের পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব ও ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের দায়িত্ব পালন করে ইইডি।
ভিডিওচিত্রটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, শওকতের পাশাপাশি কক্ষে আরও সাতজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। পারফরম্যান্স গ্যারান্টির (পিজি) মেয়াদ নিয়ে আলোচনার সময় একজনকে বলতে শোনা যায়, "পিজির মেয়াদ কবে শেষ হচ্ছে... পিজির মেয়াদের জন্য স্যারের কাছে ৫ লাখ টাকা রেখে দাও। পিজির মেয়াদ ঠিক করে নাও... আর স্যারের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করো।"
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিওতে উপস্থিত বেশ কয়েকজন ব্যক্তি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, যারা নির্মাণ প্রকল্পের অবৈধ সুবিধা হাসিলের জন্য ঘুষ দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে শওকতের বিরুদ্ধে প্রকৃত কোনো কাজ সম্পাদন না করেই ঠিকাদারদের বিল পাস করার অভিযোগ রয়েছে। অগ্রিম ও চূড়ান্ত অর্থপ্রদান করা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি প্রকল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায় অথবা সম্প্রতি শেষ করা হয় বলে জানা গেছে।
অফিসিয়াল নথি অনুসারে, কোতোয়ালির আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেরামতের জন্য কোনো কাজ না করেই ১৯ লাখ টাকার অগ্রিম চূড়ান্ত বিল প্রদান করা হয়।
সাইট পরিদর্শনের পর ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট ঢাকা মেট্রোর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ইস্যু করা এক কারণ দর্শানো নোটিশে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিশ্চিত করেন যে, কোতোয়ালি থানার সহকারী প্রকৌশলী, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ঠিকাদারের প্রতিনিধির স্বাক্ষর থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত কোনো কাজই সম্পন্ন হয়নি।
অনুরূপভাবে শওকতের নজরদারিতে মোহাম্মদপুরের ওয়েস্ট ইউসুফ হাই স্কুলের জন্য ১০ লাখ টাকা, উত্তরখান সেকেন্ডারি স্কুলের জন্য ৩.৫ লাখ টাকা, মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের জন্য ৮ লাখ টাকা এবং দাশেরকান্দি দারুচ্ছুন্নাহ আলিম মাদ্রাসার জন্য ১০ লাখ টাকাসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অগ্রিম ও যাচাইহীন বিল বিতরণের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে শওকত উত্তর দেন, "জেনে-শুনে আমি কখনোই কোনো অগ্রিম বিল প্রদান করিনি। বরং অগ্রিম বিলের চর্চা বন্ধ করতে আমি চিঠি ইস্যু করেছিলাম।"
ঢাকা মেট্রোর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফ বলেন, "আমি সম্প্রতি যোগ দিয়েছি, তাই এ বিষয়ে আমার জানা নেই।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইইডির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, শওকত তাঁর মেয়াদকালে ব্যাপক অনিয়মে জড়িত ছিলেন, যা নিয়ে বিভিন্ন প্রধান প্রকৌশলী তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও গত বছরের ১০ নভেম্বর শওকতকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে পুনরায় ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়।
এ বিষয়ে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, "ভিডিওটি এখনো আমার নজরে আসেনি। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে বিধি অনুযায়ী অবশ্যই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

