ডার্ক মোড
Friday, 10 July 2026
ePaper   
Logo
মসলা প্রকল্পে অনিয়ম –দুর্নীতির ছড়াছড়ি ১২০ কোটি টাকার প্রকল্পে বরাদ্দের অপচয় মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

মসলা প্রকল্পে অনিয়ম –দুর্নীতির ছড়াছড়ি ১২০ কোটি টাকার প্রকল্পে বরাদ্দের অপচয় মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

 

জাহাঙ্গীর খান

মসলার উৎপাদন বাড়ানো ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে প্রায় ১১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু তিন বছর না যেতেই প্রকল্প নিয়ে মাঠপর্যায়ে একের পর এক অনিয়ম, নিম্নমানের উপকরণ সরবরাহ, কাজ না করেও বিল তোলা এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে চিত্রটা আরও অস্পষ্ট, আরও উদ্বেগজনক।
অনুসন্থানে জানাগেছে,কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা। নথিতে দেখানো হয়েছে ২০২৩ -২৪ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, উন্নত জাতের বীজ বিতরণ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে—অনেক জায়গায় প্রদর্শনী প্লটের কোনো অস্তিত্বই নেই। উপজেলা কৃষি দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—“উপরে চাপ আছে। কাজ না হলেও দেখাতে হয়। না হলে বরাদ্দ কমে যায়।
জেলাভেদে কৃষকদের অভিযোগ তাদের দেওয়া বীজ ও সার নিম্নমানের। কয়েকজন কৃষক জানান, “গাছ উঠেছে ঠিকই, কিন্তু ফলন একেবারেই কম। আগের বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম পেয়েছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো দুর্নীতির স্পষ্ট ফল। ঠিকাদাররা কমদামে নিম্নমানের উপকরণ কিনে সরকারি দরপত্রের কাজ ধরছেন, আর মাঠপর্যায়ে তার সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে কৃষকের ওপর।
অনুসন্থানে আরো জানাগেছে,প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ও ভাতা পাওয়ার কথা প্রকৃত কৃষকদের। কিন্তু অনেক অঞ্চলে তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে ভুয়া নাম। স্থানীয় সূত্র জানায়—কৃষকের নাম ব্যবহার করে ভাতা তুলে নেওয়া হচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একদল দালাল ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এক ইউনিয়ন কৃষি অফিসের কর্মকর্তাকে ফোনে পাওয়া গেলে তিনি স্বীকার করেন—“তালিকা বিষয়ে কিছু ভুল–ত্রুটি থাকতে পারে, তবে আমরা যাচাই করছি।” যদিও কৃষকদের দাবি—“এসব ভুল নয়, পরিকল্পিত কারচুপি।
সংশ্লিষ্ঠ অনেকের অভিযোগ উৎপাদনের প্রকৃত চিত্র গোপন করে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে ‘সাফল্যের প্রতিবেদন’। ফলে প্রকল্প কাগজে–কলমে সফল দেখালেও বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা চলতে থাকলে সরকার বিনিয়োগ সত্ত্বেও কৃষি খাত কাঙ্ক্ষিত উন্নতি অর্জন করতে পারবে না।
দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ায় শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই হচ্ছে না—ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের মসলা উৎপাদন ও কৃষকদের জীবনযাত্রা। যারা মসলার দাম কমবে, উৎপাদন বাড়বে—এই আশায় তাকিয়ে ছিলেন, তারা এখন হতাশ।
একজন প্রবীণ কৃষক বলেন, সরকার প্রকল্প দেয় ভালো, কিন্তু নিচে এসে সব গণ্ডগোল। কেউ দেখার নেই।
জানাগেছে,প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যা ছিল ১.উন্নত জাতের মসলার বীজ উদ্ভাবন ও বিতরণ।
২.আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ। ৩.প্রদর্শনী প্লট ও প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া ৪. কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা।এদিকে অফিস সূত্রে জানাগেছে,২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। তিন বছরে এটি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সন্তোষজনক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং দুর্নীতি ও দায়সারাভাবী মনোভাব প্রকল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের কৃষি প্রকল্পে সর্বোচ্চ গুরুত্ব হওয়া উচিত মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং নিচের স্তরে মনিটরিং দুর্বল হওয়ায় প্রকল্পগুলো দুর্নীতির ‘সহজ টার্গেট’ হয়ে উঠছে।সামগ্রিক চিত্র: সরকার প্রতিবছর কৃষিখাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের টেকসই সফলতা নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতি বন্ধ করা, মাঠপর্যায়ের মনিটরিং বাড়ানো এবং সুবিধাভোগী কৃষকদের কাছে প্রকৃত সুবিধা পৌঁছানো জরুরি। অন্যথায় ১২০ কোটি টাকার মতো বড় প্রকল্পও কাগজে শেষ হবে—বাস্তবে নয়।এব্যাপারে মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প” এর প্রকল্প পরিচালক রাসেল আহমেদের সাথে যোগাযোগ করে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অফিসে গিয়ে কথা বলার কথা জানালেও পরে আর ফোন রিসিভ করেন নি। অফিসে যোগাযোগ করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন