জরাজীর্ণ ঘরে অসহায় মজনুর দিন কাটে যন্ত্রণায়। "মরতে ভয় পাই না, ভয় পাই আমার মরনের পর পরিবারটা কী খাইয়া বাঁচবে।"
নেছারাবাদ (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
যে দুই পায়ে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে পরিবারের অন্ন জুগিয়েছেন, সেই পায়েই আজ ভয়াবহ ক্ষত। অর্থের অভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে না পেরে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সুটিয়াকাটি ইউনিয়নের বালীহারি গ্রামের ষাটোর্ধ্ব মজনু মিয়ার জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তায়। গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত তাঁর পায়ের ক্ষত দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে। অসহ্য যন্ত্রণায় বিছানায় পড়ে থাকলেও তাঁর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা নিজের জীবন নয়; পরিবারের ভবিষ্যৎ।
জরাজীর্ণ একটি ঘরের বারান্দায় বিছানায় শুয়ে দিন কাটছে মজনু মিয়ার। একসময় দিনমজুরি করে স্ত্রী, ছেলে ও পুত্রবধূর সংসারের হাল ধরতেন তিনি। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করে যে আয় করতেন, তা দিয়েই চলত সংসার। কিন্তু অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে পারছেন না। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর উপার্জন। চিকিৎসার পেছনে পরিবারের সামান্য সঞ্চয়ও শেষ হয়ে গেছে।
বর্তমানে পায়ের তীব্র ব্যথা ও ক্ষতের কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না মজনু। একা উঠে দাঁড়ানোও কঠিন। অন্যের সহায়তায় কোনোমতে বসতে হয় তাঁকে। দিন-রাত কাটে শারীরিক কষ্ট আর দুশ্চিন্তায়।
মজনু মিয়া বলেন, মরতে ভয় পাই না, ভয় পাই আমার মরনের পর পরিবারটা কী খাইয়া বাঁচবে। এই পা দিয়া কত বছর কাম করছি, সংসার চালাইছি। এখন পা-ই আমারে শেষ কইরা দিতেছে। টাকার অভাবে ঠিকমতো ওষুধ খাইতে পারি না।
তিনি আরও বলেন, কয়েক মাস ধইরা বিছানায় ছটফট করি। মোরে আপনারা সাহায্য করেন। নইলে চিকিৎসা করাইতে পারমু না। প্রায় ১০ বছরেও কোনো সরকারি সাহায্য আমার ভাগ্যে জোটে নাই।
স্বামীর এমন অসহায় অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী আসমা আক্তার। বয়সের ভারে তিনিও ন্যুব্জ। ছেলে ও পুত্রবধূরও তেমন আয়-রোজগার নেই। ফলে একদিকে মজনুর চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে পরিবারের নিত্যদিনের খাবারের ব্যবস্থা দুটিই এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অসহায় এই পরিবারের ঘরটিও যেন তাদের দুর্দশার প্রতিচ্ছবি। ভাঙাচোরা ঘরে কোনো স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা নেই। নেই পর্যাপ্ত সঞ্চয় কিংবা চিকিৎসার খরচ বহনের সামর্থ্য। একসময় যিনি পরিবারের জন্য পরিশ্রম করতেন, আজ সেই মজনুকেই অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে হচ্ছে।
মজনুর কণ্ঠে নিজের জন্য যতটা না কষ্ট, তার চেয়ে বেশি উৎকণ্ঠা পরিবারের জন্য। তিনি বলেন, মুই যদি না থাকি, আমার বউ-ছেলেমেয়েরা কী খাইয়া বাঁচবে?
একজন অসহায় মানুষের এই আকুতি এখন পৌঁছেছে সমাজের মানবিক মানুষের কাছে। মজনুর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন দ্রুত আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন, প্রবাসী ও সামর্থ্যবান মানুষগুলো এগিয়ে এলে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, মজনু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে না পারায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো তাঁর কষ্ট কিছুটা লাঘব করা সম্ভব হবে।
সুটিয়াকাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. তোতা খান জানান, মজনু মিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। পরিবারটি আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সম্ভাব্য সহযোগিতার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও তাঁর চিকিৎসায় সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, শরীরের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ বা কমে যাওয়ার কারণে টিস্যু বা কোষ মারা যাওয়াকে গ্যাংগ্রিন (Gangrene) বা পচন রোগ বলে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর ও জীবননাশক রোগ। পায়ের ক্ষত বা গ্যাংগ্রিনের মতো সমস্যা অবহেলা করা উচিত নয়। এ ধরনের রোগীর দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি।
মজনু মিয়ার পরিবারের প্রত্যাশা সহৃদয় কেউ তাঁর পাশে দাঁড়াবেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার মধ্যে থাকা এই মানুষটি এখন নিজের জন্য নয়, পরিবারের ভবিষ্যতের জন্যই বাঁচার সুযোগ চান।
মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন
আপনি ও পছন্দ করতে পারেন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
আর্কাইভ!
অনুগ্রহ করে একটি তারিখ নির্বাচন করুন!
দাখিল করুন

