চটকদার বিজ্ঞাপন, ওমরাহর নামে প্রতারণা: ধর্মীয় সফরেও ‘মিথ্যার বাণিজ্য’, বিপাকে বাংলাদেশি যাত্রীরা
আলীমুজ্জামান হারুন
পবিত্র ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে যাচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। মহান আল্লাহর ঘর কাবা শরিফ ও রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষায় মানুষ জীবনের সঞ্চয় খরচ করে এই পবিত্র সফরে বের হন। কিন্তু ধর্মীয় আবেগ ও মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে একটি শ্রেণির অসাধু ওমরাহ এজেন্সি ও মোয়াল্লেমের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ প্যাকেজ বিক্রির সময় যেসব সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না। মক্কা ও মদিনায় হারাম শরিফের কাছাকাছি হোটেলে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের রাখা হচ্ছে অনেক দূরের আবাসিক হোটেলে। ফলে বয়স্ক ও অসুস্থ ওমরাহযাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
কথায় এক, বাস্তবে আরেক
ওমরাহ প্যাকেজ বিক্রির সময় অনেক এজেন্সি ও মোয়াল্লেমের পক্ষ থেকে বলা হয়—হারাম শরিফের কাছাকাছি মানসম্মত হোটেলে থাকার ব্যবস্থা থাকবে, নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিবহন থাকবে, খাবারের ব্যবস্থা থাকবে এবং পুরো সফরে দায়িত্বশীল লোকজন সহযোগিতা করবেন।
কিন্তু সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর অনেক যাত্রী দেখতে পান, তাদের থাকার হোটেল হারাম শরিফ থেকে অনেক দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়, আবার প্রতিশ্রুত পরিবহনও সময়মতো পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বয়স্ক নারী-পুরুষদের জন্য বিষয়টি হয়ে ওঠে অত্যন্ত কষ্টকর।
একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, বাংলাদেশে প্যাকেজ নেওয়ার সময় যে হোটেলের নাম বা অবস্থান দেখানো হয়েছিল, সৌদি আরবে গিয়ে কখনো কখনো তার পরিবর্তে অন্য হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেও তখন তাদের সামনে তেমন কোনো বিকল্প থাকে না।
ধর্মের নামে অধর্ম
ওমরাহ একটি পবিত্র ইবাদত। এই ইবাদতকে কেন্দ্র করে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, প্রতিশ্রুত সেবা না দেওয়া কিংবা ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা শুধু ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়—এটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গেও প্রতারণা।
যারা জীবনের বহু বছরের সঞ্চয় থেকে অর্থ জমিয়ে ওমরাহ করতে যান, তাদের বড় একটি অংশ সৌদি আরবের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে জানেন না। ফলে এজেন্সি বা মোয়াল্লেমের দেওয়া তথ্যকেই তারা বিশ্বাস করেন।
এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি প্যাকেজের সুবিধা কমিয়ে দেন, হোটেল পরিবর্তন করেন কিংবা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন, তাহলে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ একই সঙ্গে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
মক্কা-মদিনায় দূরের হোটেল, বাড়ছে ভোগান্তি
ওমরাহযাত্রীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো—মক্কা ও মদিনায় হোটেলের দূরত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া।
‘হারাম শরিফের কাছাকাছি’, ‘১০ মিনিটের হাঁটা পথ’, ‘১২ মিনিটের দূরত্ব’—এ ধরনের কথা বলে প্যাকেজ বিক্রি করা হলেও বাস্তবে অনেক যাত্রীকে এমন জায়গায় রাখা হয়, যেখান থেকে হারাম শরিফে যেতে পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বয়স্ক ওমরাহযাত্রীদের জন্য এ সমস্যা আরও গুরুতর। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তারাবি, তাওয়াফ, সাঈসহ বিভিন্ন ইবাদতের জন্য বারবার যাতায়াত করতে গিয়ে তারা শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
‘মোয়াল্লেম’ কোথায়?
ওমরাহযাত্রীদের অভিযোগ, বাংলাদেশে প্যাকেজ বিক্রির সময় মোয়াল্লেম বা দায়িত্বশীল প্রতিনিধির উপস্থিতি ও সহযোগিতার কথা বলা হলেও সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর অনেক ক্ষেত্রে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
কোনো সমস্যা হলে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অনেকে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা পান না। ভাষাগত সমস্যা, অপরিচিত পরিবেশ এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন নিয়মকানুন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তখন যাত্রীরা অসহায় হয়ে পড়েন।
অনেক যাত্রীর প্রশ্ন—যদি একজন মোয়াল্লেম বা এজেন্সি প্যাকেজের দায়িত্ব নেয়, তাহলে যাত্রীরা সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে না কেন?
প্যাকেজের আগে লিখিত নিশ্চয়তা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওমরাহ প্যাকেজ নেওয়ার আগে শুধু কথার ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি বিষয় লিখিতভাবে নেওয়া জরুরি।
হোটেলের নাম, হারাম শরিফ থেকে প্রকৃত দূরত্ব, খাবারের ব্যবস্থা, বিমানবন্দর থেকে যাতায়াত, মক্কা-মদিনার অভ্যন্তরীণ পরিবহন, গাইড বা মোয়াল্লেমের দায়িত্ব, প্যাকেজের বাইরে অতিরিক্ত কোনো অর্থ লাগবে কি না—সবকিছু চুক্তিতে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্যাকেজে যে হোটেলের ছবি দেখানো হয়, সেটিই দেওয়া হচ্ছে কি না এবং হোটেলটি আসলে কত দূরে—সেটিও যাচাই করা দরকার।
নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়ানোর দাবি
ওমরাহযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ওমরাহ পরিচালনাকারী এজেন্সি ও মোয়াল্লেমদের কার্যক্রম আরও কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় আনা।
একই সঙ্গে প্রতিটি ওমরাহ প্যাকেজে হোটেলের প্রকৃত দূরত্ব, পরিবহন ব্যবস্থা, খাবার ও অন্যান্য সেবার বিস্তারিত তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে।
কারণ ওমরাহ কোনো সাধারণ পর্যটন ভ্রমণ নয়। এটি কোটি কোটি মুসলমানের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ইবাদত। সেই ইবাদতকে কেন্দ্র করে যদি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রতারণা কিংবা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা বন্ধ করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়—ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানুষের বিশ্বাস রক্ষারও বিষয়। ##
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর মাদানী হজ্ব ও ওমরা ব্যবসায়ী মুফতি মিজানুর রহমান জানান.
শুধু মোয়াল্লেম ও এজেন্সি কে বললেন। যাত্রীরা শুধু কম খুঁজে এটার বিষয়ে কিছু বলেন না ? এটা বলার দরকার যে কম খরচে গিয়ে ভালো সার্ভিস কেমনে পাবে?
যাওয়ার আগে শুধু কম খুঁজে আর যাওয়ার পরে শুধু ভালো সার্ভিস খুঁজে

