ডার্ক মোড
Monday, 28 September 2026
ePaper   
Logo
সংবাদ বিশ্লেষণ :  সাংবাদিক আজাহার আলীর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?

সংবাদ বিশ্লেষণ : সাংবাদিক আজাহার আলীর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?

বিশেষ প্রতিনিধি

বিএনপি সমর্থিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আজহার আলী সরকারের অকাল মৃত্যু কেবল একজন প্রবীণ গণমাধ্যমকর্মীর জীবনাবসান নয়; এটি দেশের বিচারিক ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং বন্দীদের মানবাধিকার নিয়ে চরম এক আশঙ্কাজনক বার্তা দিয়ে গেল।

একসময় দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ ও ‘আমাদের সময়’-এর মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা এই প্রবীণ সাংবাদিককে যেভাবে দফায় দফায় সন্ত্রাসী আইনের মামলায় জড়িয়ে জেলে আটক রাখা হলো, তা পুরো গণমাধ্যম সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজহার আলী সরকার দীর্ঘদিন ধরেই কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিসসহ একাধিক গুরুতর ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও গত বছরের ১০ অক্টোবর বনশ্রীর বাসভবন থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলা এবং গ্রেপ্তার দেখানোর এই কৌশল কীভাবে একজন শারীরিক অসুস্থ মানুষকে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে।


১. ‘শোন অ্যারেস্ট’ বা গ্রেপ্তার দেখানোর ফাঁদ:
আমেরিকান নাগরিক এনায়েত করিমের একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর যখন তাঁর মুক্তির সুযোগ তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই শাহবাগ থানায় হস্তান্তরিত ‘মঞ্চ ৭১’-এর মামলায় তাঁকে আবার নতুন করে ‘শোন অ্যারেস্ট’ (Show Arrest) দেখানো হয়। ১৮ জুনের সেই আবেদনের পর ২৯ জুন যখন তাঁকে আদালতে তোলা হয়, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে তাঁকে হুইলচেয়ারে করে হাজির করতে হয়েছিল। গুরুতর অসুস্থতার স্বপক্ষে পরিবার বারবার জামিন আকুতি জানালেও তা মেলেনি। এই প্রশাসনিক জটিলতা ও শোন অ্যারেস্টের ফাঁদে আটকে তাঁর মুক্তি বিলম্বিত হয়।

২. মব সন্ত্রাস বনাম প্রশাসনিক দ্বিচারিতা:
রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘মঞ্চ ৭১’-এর একটি আয়োজনে যে অনাকাঙ্ক্ষিত মব হামলা এবং মব জাস্টিসের ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে উল্টো লতিফ সিদ্দিকীসহ উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়। আর সেই একই মামলায় অসুস্থ আজহার আলী সরকারকে নতুন করে জড়িয়ে বিচারিক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করা হয়। বিচার পাওয়ার বদলে উল্টো এই প্রক্রিয়ায় একজন নাগরিককে বন্দি রাখা ও চিকিৎসাবঞ্চিত করার বিষয়টি কতটুকু আইনের শাসনের সাথে সংগতিপূর্ণ—তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. কারাগারে চিকিৎসার অভাব ও বিলম্বিত বিচার:
পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ, দীর্ঘ ১০ মাস কারাগারে থাকা অবস্থায় আজহার আলী সরকার যথাযথ চিকিৎসা পাননি। ১৭ আগস্ট আদালত তাঁকে জামিন দিলেও ততোদিনে ধুঁকে ধুঁকে চলা তাঁর শারীরিক অবস্থা প্রায় অপরিবর্তনীয় ক্ষতির মুখে পড়ে। জামিনে মুক্ত হওয়ার মাত্র এক মাস দশ দিনের মাথায় (২৭ সেপ্টেম্বর) মহাখালীর শমরিতা হাসপাতাল থেকে বিএসএমএমইউ (পিজি) হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাস্তায় তাঁর মৃত্যু—প্রমাণ করে যে, আইনি বিলম্ব এবং উপযুক্ত চিকিৎসার অভাব কীভাবে একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে।

দায়ভার কার ?

একজন পেশাদার সাংবাদিক, যার সাথে বহু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের জানাশোনা ছিল, তাঁকেই যদি একটির পর একটি অস্পষ্ট রাজনৈতিক বা সন্ত্রাসী মামলায় জড়ায়ে হুইলচেয়ারে আদালতে ঘুরতে হয়, তবে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার জায়গা কোথায়? মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অনুভূতির কারণে আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার করে কাউকে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

আজহার আলী সরকারের এই অকাল ও করুণ পরিণতি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়রানির এক নিষ্ঠুর দলিল।অন্তবর্তী কালীন সরকারের ইউনুস আমলে তিনি কেন গ্রেপ্তার হলেন, কোন তথ্যের ভিত্তিতে বা কার নির্দেশে একের পর এক মামলায় জড়ানো হলো এবং কেন তাঁর চিকিৎসায় অবহেলা করা হলো—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

অন্যথায়, আইনের শাসন ও জননিরাপত্তা নিয়ে সমাজে যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা চিরতরে স্থায়ী রূপ নেবে।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন