শেবাচিমের শিক্ষা সফরে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা: অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় খাদে বাস, অল্পের জন্য প্রাণরক্ষা অর্ধশতাধিক হবু ডাক্তারের!
মাসুদ রানা, বরিশাল অফিস:
উন্নত বাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়, মদ্যপ চালকের হাতে অনভিজ্ঞ ড্রাইভিং, আর দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক উদাসীনতা—সব মিলিয়ে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বলি হতে বসেছিলেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। কক্সবাজারগামী শিক্ষা সফরের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে গিয়ে অন্তত ২৬ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। অলৌকিকভাবে প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন বাসে থাকা ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার জিংলাতলী এলাকায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
ঘটনার বিবরণ:
কলেজ সূত্রে জানা যায়, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের নিয়মিত বার্ষিক শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টার দিকে চারটি বাসে করে ৪৪তম ব্যাচের মোট ২৩৪ জন শিক্ষার্থী কক্সবাজারের উদ্দেশে বরিশাল ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে ভোররাতে দাউদকান্দির জিংলাতলী এলাকা অতিক্রম করার সময় অনিয়ন্ত্রিত গতিতে থাকা একটি বাস চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে সেটি বিকট শব্দে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। দুর্ঘটনায় বাসে থাকা অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ জন মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন।
অব্যবস্থাপনা ও 'চুক্তির নামে প্রতারণা'র অভিযোগ:
শিক্ষার্থীরা জানান, সফর আয়োজনের শুরু থেকেই পরিবহন ব্যবস্থা ও সেবার মান নিয়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। বাজেট অনুযায়ী মানসম্মত বাস না দেওয়ায় তারা আপত্তি জানালে কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি ট্রাভেল এজেন্সির শরণাপন্ন হয়। ট্রাভেল এজেন্সি ও কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় ‘উন্নতমানের ও নিরাপদ বাস’ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থও আদায় করা হয়। কিন্তু বাস্তবতায় তাদের দেওয়া হয় ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের বাস।
মদ্যপ চালক ও কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি:
আহত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভ্রমণের শুরু থেকেই বাসটির চালকের আচরণ অস্বাভাবিক ছিল এবং দুর্ঘটনার সময় তিনি পূর্ণ মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
দুর্ঘটনার পর কলেজ প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকায় ক্ষোভের আগুন জ্বলছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। দুর্ঘটনাকবলিত শিক্ষার্থী সামিন রেজা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভোর সাড়ে ৪টায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলেও দুপুর পর্যন্ত কলেজ কর্তৃপক্ষের কেউ আমাদের খোঁজ নিতে বা সহযোগিতার হাত বাড়াতে এগিয়ে আসেননি। রক্তাক্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় আমাদের নিজেদেরই সব সামলাতে হয়েছে। হবু চিকিৎসক হয়ে আজ আমরা নিজেরাই কোনো অভিভাবক পেলাম না, যা অত্যন্ত হতাশাজনক ও লজ্জাজনক।”
কলেজ প্রশাসনের বক্তব্য:
ঘটনার সততা স্বীকার করে শেবাচিমের অফিস সহকারী (শিক্ষার্থী প্রতিনিধি) মোহাম্মদ রনি বলেন, “সোমবার বিকেলে ২৩৪ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে চারটি বাস রওনা হয়, যার একটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। সংবাদ পাওয়ার পর কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছেন।”
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তির দাবি:
এই ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা অনতিবিলম্বে পুরো ঘটনার উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। দুর্ঘটনাটি কি নিছকই চালকের ভুল, নাকি ট্রাভেল এজেন্সি ও সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও অব্যবস্থাপনার ফল—তা খতিয়ে দেখে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি তুলেছেন তারা।
মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন
আপনি ও পছন্দ করতে পারেন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
আর্কাইভ!
অনুগ্রহ করে একটি তারিখ নির্বাচন করুন!
দাখিল করুন

